আপনজন ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলে ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি পিভি সঞ্জীব কুমারের নেতৃত্বাধীন দুই বিচারপতির বেঞ্চ কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত হওয়া কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি শাব্বর রশিদির সমন্বয়ে গড়া ডিভিশন বেঞ্চ চাকরিতে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের ১১২টি মামলার একত্রে শুনানি শেষে ওই রায় ঘোষণা করেছিল।
কলকাতা হাইকোর্টে রাজ্যের এসএসসি প্রদত্ত ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের করা আবেদনের শুনানিতে বৃহস্পতিবার এই রায় দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
শীর্ষ আদালত তার রায়ে বলেছে, আমরা চাকরির নিয়োগ ষংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখেছি। এই মামলার ফলাফল সম্পর্কে, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি কারসাজি এবং জালিয়াতি করা হয়েছে। ফলে বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনো কারণ নেই। ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রার্থীদের বরখাস্ত করতে হবে। এসব নিয়োগে প্রতারণা জালিয়াতি স্পষ্ট।
হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ করার কোনও কারণ খুঁজে না পেয়ে শীর্ষ আদালত বলেছে যে নতুন বাছাই প্রক্রিয়ায় কলঙ্কিত প্রার্থীদের জন্যও শিথিলতা থাকতে পারে।
তবে আদালত স্বস্তি দিয়েছে যে ইতিমধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রার্থীদের এখনও পর্যন্ত দেওয়া বেতন ফেরত দিতে হবে না এবং নির্দেশ দিয়েছে যে নতুন বাছাই প্রক্রিয়া ৩ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে কলকাতা হাইকোর্ট সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে ২৫,৭৫৩ জন কর্মচারীর (শিক্ষক ও অশিক্ষক উভয়ই) নিয়োগ বাতিল করেছিল। হাইকোর্ট তার রায়ে বলে, ২৩ লক্ষ উত্তরপত্রের মধ্যে কোনটি মূল্যায়ন করা হয়েছে সে সম্পর্কে কোনও স্পষ্টতা নেই এবং তাই সমস্ত উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল কলকাতা হাইকোর্টের সরকারি স্কুলগুলিতে রাজ্যের এসএসসি কর্তৃক প্রণীত ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল করার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল।
শীর্ষ আদালতে দায়ের করা আবেদনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার বলেছে, হাইকোর্ট “ইচ্ছাকৃতভাবে” এবং কোনও উপযুক্ত কারণ ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করেছে।
এর আগে, একটি শুনানিতে শীর্ষ আদালত পশ্চিমবঙ্গে কথিত নিয়োগ দুর্নীতিকে “পদ্ধতিগত জালিয়াতি” বলে অভিহিত করে। সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে বলে, স্কুল সার্ভিস কমিশন ২৫ হাজার ৭৫৩ জন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগের সাথে সম্পর্কিত ডিজিটালাইজড রেকর্ড বজায় রাখতে বাধ্য।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, এই নিয়োগে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এই অভিযোগে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়সহ তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন নেতা ও সরকারি কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁরা এখনো কারাগারে রয়েছেন।
এর আগে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্ট প্রথম ২৫ হাজার ৭৫২ জনের চাকরি বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেদিন হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর এসএসসির চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এই রায়কে অবৈধ বলে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পরে সেই আদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও রাজ্যের চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান এসএসসি। সেসময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘এখন তো এখানকার বিচারালয় বিজেপির বিচারালয় হয়ে গেছে। দিল্লির বিজেপির দপ্তরের নির্দেশে বিচারক নিয়োগ হয়। বিচার হয়। আমরা আজকের রায়কে অবৈধ মনে করি। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছি।’
মমতা আরও বলেছিলেন, ‘ওরা জেলে পাঠাবে, আমি তৈরি। আমি হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করছি। আমি চাকরিহারাদের পাশে আছি। আমার যত দূর যেতে হয় যাব। আমি তৈরি।’
সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হওয়ার পর সেই মামলার শুনানি শেষ হয় গত ১০ ফেব্রুয়ারি। যদিও এই নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোট সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল, এই নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠের হেফাজত থেকে ৫০ কোটি নগদ টাকা উদ্ধার হয়েছিল।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct