জাইদুল হক, আপনজন: আপনজন: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটা বড় ভূমিকা পালন করে থাকেন সংখ্যালঘুরা। বিশেষত কি লোকসভা কি বিধানসভা— সবক্ষেত্রের তারাই মূলত নির্ণায়ক শক্তি যাদের উপর নির্ভর করে থাকে রাজ্যের মসনদে কে বসবে। রাজ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু। তাই নির্বাচনে তাদের ভূমিকা অস্বীকার করার নয়। বরাবরই দেখা গেছে রাজ্যের সংখ্যালঘুদের ভোট যে দিকে গেছে তারাই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে। দীর্ঘ ৩৫ বছরের বাম শাসনে তাদের ভোট ব্যাঙ্ক হয়ে উঠেছিল সংখ্যালঘুরা। ২০১১ সালের পর থেকে তা পরিবর্তিত হয়ে চলে গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। উল্লেখ্য, ২০১১ সাল ও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ৫৯জন করে সংখ্যালঘু বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২১ সালে তা কমে হয় ৪৬। বর্তমানে সদ্য প্রয়াত হাড়োয়ার বিধায়ক হাজী নুরুল ইসলামকে বাদ দিলে মোট মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ৪৫। এর মধ্যে শুধু শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের রয়েছে ৪৪জন মুসলিম বিধায়ক। মাত্র একজন বিরোধী দলের। তিনি হলেন ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক আইএসএফের পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকী।
এ িবশাল সংখ্যক সংখ্যালঘু বিধায়কের উপর রাজ্যের সংখ্যালঘুদের বহু আশা ভরসা। মুসলিম বিধায়করা সাধারণ সংখ্যালঘু প্রধান এলাকা থেকেই নির্বাচিত, তাই সঙ্গত কারণে রাজ্য বিধানসভায় সেই এলাকার সমস্যা ও দাবির কথা তাদের উত্থাপন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ২০২১ সালের পর থেকে সদ্য বিধানসভা অধিবেশন পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের বিষয় তেমন উত্থাপন করেননি মুসলিম বিধায়করা। কয়েকজন বাদে কোনও মুসলিম বিধায়ক আজও বিধানসভার মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে একদিনের জন্য অংশ নেননি।
রাজ্য বিধানসভা সুত্র জানা গেছে, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের পর বিধানসভার প্রধম অধিবেশন থেকে ২০২৪-এর চতুর্থ অধিবেশন পর্যন্ত রাজ্যের ৪৬জন সংখ্যালঘু বিধায়কের মধ্যে মাত্র কয়েকজনই বিধানসভায় মৌখিক প্রশ্নোত্তরে শামিল হয়েছেন। তারা হলেন, ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক আইএসএফের পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকী, বসিরহাট উত্তর বিধানসভার বিধায়ক রফিকুল ইসলাম মণ্ডল, কেতুগ্রামের বিধায়ক সেখ শাহনওয়াজ, ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক সওকাত মোল্লা, লালগোলার বিধায়ক মুহাম্মদ আলি, মেটিয়াবুরুজের বিধায়ক আবদুল খালেক মোল্লা, ভগবানগোলার প্রয়াত বিধায়ক ইদ্রিশ আলি, ইটাহারের বিধায়ক মোশারফ হোসেন, ডেবরার বিধায়ক হুমায়ুন কবির, মালদার মালতীপুরের বিধায়ক আবদুর রহিম বক্সি, হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক তজমুল হোসেন, সামশেরগঞ্জের বিধায়ক আমিরুল ইসলাম।
বিষয় হল, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী। সেই জনগোষ্ঠীর বিধায়কদের বেশিরভাগই বিধানসভায় গিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াকেই বেছে নিয়েছেন। যদিও রাজ্যের সংখ্যালঘুরা আশা করে থাকেন সমাজজীবনে তাদের নানা সমস্যার কথা হয়তো তুলে ধরবেন এই সব জনপ্রতিনিধিরা। সংখ্যালঘুদের প্রসঙ্গ তো দূরের কথা, এলাকার অন্য সাধারণ সমস্যা কিংবা উন্নয়ন নিয়ে রাজ্য সরকারের কি পরিকল্পনা তা জানারও চেষ্টা করেননি অধিকাংশ সংখ্যালঘু বিধায়ক। অথচ, সংখ্যালঘুদের ভোটের উপর ভর করেই তাদের জয়। তবে, ব্যতিক্রম আছে। মাসক দলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক কিন্তু নিয়মিত এলাকার বা রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে রাজ্য সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা পদক্ষেপ কি তা জানতে দ্বিধাবোধ করেননি। বিরোধী দলের মধ্যে একমাত্র সংখ্যালঘু বিধায়ক ভাঙড় থেকে জয়ী পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকী অবশ্য নিয়মিত মুসলিম, দলিত সহ অন্যান্য নানা বিষয়ে কি পরিস্থিতি জানতে চেয়েছেন। তবে, শাসক দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের বিষয় উল্লেখ করে বিধানসভায় মৌখিক প্রশ্নোত্তরে অংশ নিয়েছেন হাতে গোনা কয়েজন বিধায়ক। বিধানসভায় মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেওয়া বাকি সংখ্যালঘু বিধায়করা যেসব বিষয়গুলো সামনে এনেছেন, তার মধ্যে, কন্যাশ্রী থেকে শুরু করে গঙ্গার ভাঙন, জেলবন্দিদের সংখ্যা, গ্রন্থাগার প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ্যযোগ্য। পর্যায়ক্রমে সেগুলি উল্লেখ করা হবে।
তবে, যে কজন মুসলিম বিধায়ক বিধানসভায় প্রশ্নে সরব তাদের মধ্যে প্রথমে নওশাদ সিদ্দিকীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর নওশাদ সিদ্দিকী বিধানসভায় জানতে চান, ‘এটা কি সত্যি যে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাক-এর প্রতিনিধি দল পরিদর্শন করেনি। সত্যি হলে এর কারণ কি।’
শাসক দলের বিধায়ক অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস তথা ডেবরার তৃণমূল বিধায়ক ড. হুমায়ুন কবিরও মুসলিম প্রসঙ্গ বিধানসভায় তুলতে ভয়ডর করেননি। ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই ডেবরার বিধায়ক হুমায়ুন কবির বিধানসভা জানতে চান, ‘এটা কি ঘটনা যে বিভিন্ন সমীক্ষায় প্রকাশিত হওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী এসসি সম্প্রদায়ের থেকে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ মুসলিম মহিলাদের? যদি তাই হয়, তাহলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা এসসি এসটি মহিলাদের মতো ৫০০ থেকে হাজার টাকা করা হবে কি মুসলিম মহিলাদের?’ সূত্রের খবর, বিধানসভায় এই অবাঞ্ছিত প্রশ্ন তোলায় তৃণমূল কংগ্রেসে তা চর্চার বিষয় হয়ে দাঁিড়য়েছিল। তবে, শাসক দলের অন্য একজন মুসলিম বিধায়ক রাজ্যের মুসলিমদের উন্নয়ন বা তাদের সমস্যার কথা জানতে না চাইলেও অন্য পশ্চাদপদ শ্রেণিদের কথাও জানতে চেয়েছেন। তিনি হলেন, উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের বিধায়ক মোশারফ হোসেন। রাজ্যের তৃণমূল সংখ্যালঘু সেলের চেয়ারম্যন তথা ইটাহারের বিধায়ক মোশারফ হোসেন ২০২২ সালের ১৬ জুন বিধানসভা জানতে চান, ‘বর্তমান অর্থ বর্ষে রাজ্যে এসসি এসটি মানুষদের উন্নয়নে কত টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২২ সালের ২২মে পর্যন্ত ইটাহার বিধানসভার এসসি, এসটি অধ্যুষিত এলাকায় কি কি উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’ তিনি সংখ্যালঘু এলাকা থেকে নির্বাচিত হলেও তার এলাকায় সংখ্যালঘু উন্নয়নে রাজ্য সরকারের পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞেস না করে শুধু এসসি, এসটির বিষয়ে জানতে চেয়ে ‘পরম উদারতা ও সহমর্মিতা’র পরিচয় দিয়েছেন।
এর থেকে সহেজই অনুমেয় রাজ্যের সংখ্যালঘু বিধায়কদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু সমাজের কথা তো অনেক দূর, নিজের এলাকার বিষয় নিয়েও বিধানসভায় জানতে চাওয়ার বিষয়ে চরম অনীহা দেখিয়ে চলেছেন। অনেকটা ‘আসি যাই মাইনে পাই’ প্রবাদ বাক্যের মতো।
যদিও বলতে দ্বিধা নেই, সাধারণ মানুষের কথা এই সব বিধায়করা বিধানসভায় না তুললেও মাস গেলে তাদের বেতন কাঠামো কিন্তু মন্দ নয়। যদিও রাজ্য বিধানসভা সুত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্যের মন্ত্রী ও বিধায়কদের বর্ধিত বেতন কাঠামো ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। সেই অনুযায়ী বর্তমানে রাজ্যের একজন বিধায়ক মাস গেলে পেয়ে থাকেন ১ লক্ষ ২২ হাজার টাকা। এর মধ্যেই বিভিন্ন ভাতা ১২০০০ টাকা (নিজের বিধানসভা এলাকা পরিদর্শনের জন্য মাস প্রতি ৪০০০ টাকা, কম্পিউটার, ইন্টারনেট প্রভৃতির জন্য ৫০০০ টাকা, অন্যান্য ভাতা মাস প্রতি তিন হাজার টাকা)। বিধানসভা ও কমিটির বৈঠকে যোগদানের ভাতা ৬০০০০ টাকা (দৈনিক ২০০০ টাকা)। এছাড়া দুবার বা তার বেশি বছরের বিধায়করা বর্ধিত ভাতা পান। তারপরও বিশেষ করে মুসলিম বিধায়কদের অধিকাংশের মধ্যে বিধানসভায় গিয়ে অনন্তপক্ষে নিজের এলাকার কথা বিধানসভায় না তুলে ধারাটা রাজ্যের মুসলিমদের জন্য ভাগ্যের বিড়ম্বনা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে।
(ক্রমশ...)
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct