বিশেষ প্রতিবেদক, কলকাতা, আপনজন: তামিলনাডুর চেন্নাইয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা এক পরিযায়ী শ্রমিকের অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও রাজ্য সরকারের পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়নে বোর্ড সোমবার ৩৫ বছর বয়সি বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকউন্নয়ন বোর্ড সামার খানের অনাহারে মারা যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। অপরদিকে রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বসু তার কর্মীদের কাছে একটি বার্তায় বাংলা থেকে কাজের সন্ধানে অন্য জায়গায় যাওয়া অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গ্রেটার চেন্নাই কর্পোরেশনের এক আধিকারিক বলেন, এক এজেন্ট ওই শ্রমিকদের পোন্নেরিতে নিয়ে যায়, যিনি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেন এবং তাঁদের থাকা-খাওয়ার কোনও ব্যবস্থা দেননি।
দক্ষিণ রেলের একটি প্রেস নোটে উল্লেখ করা হয়েছে যে ১২ জন যাত্রীর কাছে হাওড়া যাওয়ার অসংরক্ষিত টিকিট ছিল এবং চেন্নাই থেকে হাওড়াগামী করমণ্ডল এক্সপ্রেসে ওঠার পরিকল্পনা ছিল। তারা কমপক্ষে পাঁচ দিন না খেয়ে কেবল জল খেয়ে বেঁচে ছিল। তবে তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। রেল পুলিশ তাদের উদ্ধার করে খবর দেয়। রেলওয়ে কর্মকর্তারা তাদের রাজীব গান্ধী জেনারেল হাসপাতালে রেফার করার আগে স্টেশনের জরুরি যত্ন কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। তবে চেন্নাই পুর আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে তাদের মধ্যে পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাঁচ পরিযায়ী শ্রমিকের অ্যাকিউট গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস ও ডিহাইড্রেশন ধরা পড়েছিল। পাঁচজনের মধ্যে সঙ্কটজনক সমর খানকে বুধবার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট থেকে সরিয়ে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়। মানিক ঘোড়ই, সমর খান এবং সত্য পণ্ডিত নামে তিনজন রোগীর মারাত্মক তরল ক্ষতির কারণে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়েছিল। তারা ডায়রিয়া এবং বমির কথা জানিয়েছিল, যা দূষিত খাবার বা জল থেকে বলে চিকিৎসকরা সন্দেহ করেছিলেন। এদের মধ্যে সামার খানেরই মৃত্যু হয়। এ ব্যাপাারে রাজীব গান্ধি গভর্নমেন্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক থেরানি রাজন বলেন, সামার খানের মৃত্যুর কারণ ইউরেমিক এনসেফালোপ্যাথি, অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি স্টেজ-৩, ভেন্টিলেটর অ্যাসোসিয়েটেড নিউমোনিয়া ও সেপসিস।
গণেশ মিধা ও আসিফ পণ্ডিতকে ১৩ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া দেওয়া হয়। পরে মানিক ঘোড়ইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি সাতজনকে হাসপাতালের নিকটবর্তী পুরুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা তাদের খাবার ও চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। পশ্চিমবঙ্গে ক্যাডারের এক অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার ইজরায়েল জেবাসিং বিমানযোগে মৃতের দেহ তার নিজের গ্রামে পাঠানোর প্রচেষ্টা সমন্বয় করছেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের দেখভালে তিনি রাজীব গান্ধি হাসপাতালে ছিলেন তিনি।
পুর আধিকারিক জানান, পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের এক অবসরপ্রাপ্ত আমলা তাঁদের আর্থিক সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা তাদের মধ্যে তিনজনকে বিমানে ও পাঁচজনকে ট্রেনে কলকাতায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তারা কেবল বাংলায় কথা বলত এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে হিন্দিভাষী চিকিৎসকরা তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে পারেননি।
পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারপার্সন সাংসদ সামিরুল ইসলাম এক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রাজ্যের আধিকারিকরা ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং খাদ্যে বিষক্রিয়া সন্দেহে তাঁদের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থেকে পরিবারকে না জানিয়ে চেন্নাই যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের দলটিকে দালাল সাড়া না দেওয়ায় বেকায়দায় পড়ে যায়। আমরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। অনাহারে থাকার কোনও দাবি অস্বীকার করেন সাংসদ।
তিনি জানান, দশ দিন ধরে চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর ৩০ সেপ্টেম্বর মারা যান পরিযায়ী শ্রমিক সমর খান। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চেন্নাই সেন্ট্রাল রেলওয়ের এমজিআর স্টেশনে কয়েকদিনের খাবার কেনার টাকা না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি সহ অন্যান্য পরিযায়ী শ্রমিকরা।
রাজ্যের পরিযায়ী কল্যাণ পর্ষদের তরফে জানানো হয়েছে, ওই শ্রমিকরা ‘আবর্জনা মেশানো খাবার খেয়ে’ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সমর খানের মৃত্যুর পর ওই পরিযায়ী শ্রমিকের এক আত্মীয় ট্রেনে চেন্নাই আসছেন এবং ওই শ্রমিকের দেহ রাজ্যে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। পুরসভার এক আধিকারিক সংবাদমাধ্যকে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁদের মধ্যে সাতজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে ১০ হাজার এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের ২৫ হাজার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct