গান্ধীজির একদিকে অহিংসার ব্রত ও সত্যাগ্ৰহ এবং অন্যদিকে উদ্দীপিত তেজ ও মানসিক সাহস কেবলমাত্র তাঁর ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করেনি বরং তা সমগ্ৰ ভারতীয় উপমহাদেশে সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনা ও কর্মকান্ড প্রায় দুশো বছরের শোষিত ভারতবাসীকে মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছিল। সারা জীবন তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে অহিংসা কেবলই দুর্বলের মুখোশ নয় বরং তা সবলের শক্তি। লিখেছেন এম ওয়াহেদুর রহমান...
এ মানবজীবন নশ্বর! কিন্তু মানবজীবনের মূল্য তাঁর আয়ুর পরিধিতে বিচার্য নয়। মানুষের কাজ ও কৃতিত্বের নিরিখেই তাঁর চিরজীবিতা নির্ভর করে। তাঁর ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা তথা কর্মকাণ্ডের অনন্যতাই সেই ব্যক্তি মানুষটিকে অবিস্মরণীয় সর্বোপরি সর্বজন শ্রদ্ধেয় করে তোলে। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ওরফে ‘ বাপু ‘(বাবা )কিংবা ‘ মহাত্মা গান্ধী ‘ ( মহান আত্মা)এমনই একজন অমিতেজ কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত, ত্যাগব্রতী সন্যাসী, আমৃত্যু অহিংসার পূজারি - ‘জাতির জনক’; যিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তিম নিদ্রায় নিদ্রিত হলে ও আজো প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদমাঝে অম্লান ও মৃত্যুঞ্জয়ী ।গান্ধীজির ‘ করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে ‘(Do or Die) এবং ‘ইংরাজ ভারত ছাড়ো ‘ (Quit India) রণধ্বনি তামাম ভারতবাসীদের উত্তাল করে তুলেছিল। তাঁর মহাত্মার প্রচন্ড মানবিক শক্তি গোটা দেশের বুকজোড়া জড়ত্বের জগদ্দল পাথরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি পরাধীন ভারতের দিশেহারা পথভ্রান্ত আপামর জনতাকে জাতীয়তাবোধের প্রবল উন্মাদনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। গান্ধীজির মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছিল সত্য,প্রেম, অহিংসা ও সর্বোদয়। তিনি জনগণকে ত্যাগের মহানব্রতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
গান্ধীজির একদিকে অহিংসার ব্রত ও সত্যাগ্ৰহ এবং অন্যদিকে উদ্দীপিত তেজ ও মানসিক সাহস কেবলমাত্র তাঁর ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করেনি বরং তা সমগ্ৰ ভারতীয় উপমহাদেশে সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনা ও কর্মকান্ড প্রায় দুশো বছরের শোষিত ভারতবাসীকে মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছিল। সারা জীবন তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে অহিংসা কেবলই দুর্বলের মুখোশ নয় বরং তা সবলের শক্তি। তিনি ১৮৯১ সালে ব্যারিস্টার পাস করে বোম্বে হাইকোর্টে যোগদান করেন। তবে তিনি ১৮৯৩ সালে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে ও পরাধীন কালা আদমির উপর চলছিল পরাক্রান্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিষ্ঠুর অত্যাচার। প্রকাশ পায় দাম্ভিক শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের নগ্ন বর্বরতা। দিন দিনই বাড়ে ভারতীয় বণিক এবং শ্রমিক শ্রেণির উপর অমানুষিক নির্যাতন । গান্ধীজি এই অপমানিত তথা মানহারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। গড়ে তুলেন ‘নাটাল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস‘। এই প্রতিষ্ঠানই হলো নিষ্পেষিত, নির্যাতিত প্রবাসী ভারতীয়দের মর্যাদা রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। এই ‘নাটাল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ হলো গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম ক্ষেত্র ।এর মধ্য দিয়েই তিনি শুরু করেন আপোষহীন আন্দোলন। দক্ষিণ আফ্রিকায় নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের নাগরিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গান্ধী প্রথমে তাঁর অহিংস শান্তিপূর্ণ নাগরিক আন্দোলনের মতাদর্শ প্রয়োগ করেন। ভারতে ফিরে আসার পরে দু:স্থ কৃষক - দিনমজুরকে সঙ্গে নিয়ে বৈষম্যমূলক কর আদায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেন এবং দেওবন্দীদের অধীনে খেলাফত আন্দোলন শুরু করেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর তিনি সমগ্ৰ ভারতব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী স্বাধীনতা, বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, বর্ণ বৈষম্য দূরীকরণ, জাতির অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রচার শুরু করেন। তবে এই সবগুলোর মূলে ছিল স্বরাজ অর্থাৎ ভারতকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে।
১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে স্বাধীনতা আন্দোলনের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নেন। ১৯১৭ - ১৯১৮ সালে বিহারের চম্পারণে নীল চাষীদের উপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেন ‘ চম্পারণ সত্যাগ্ৰহ ‘। ১৯৩০ সালে তিনি ভারতীয়দের লবণ করের বিরুদ্ধে ৪০০ কিলোমিটার পথ পরিক্রমা করেন এবং ‘ লবণ সত্যাগ্ৰহ ‘ আন্দোলন (যা ‘ডান্ডি অভিযান’ নামে পরিচিত) গড়ে তুলেন। ফলে স্পন্দিত হয় আসমুদ্র হিমাচল । ভারতের জনমনে সৃষ্টি হয়েছিলো উত্তাল তরঙ্গ। সশস্ত্র ইংরেজ বাহিনী ভীত হয়ে উঠে। পথ ছেড়ে দেয় নিরস্ত্র সংগ্ৰামের এই সেনানায়ককে। ১৯৪২ সালে গান্ধী ‘ ভারত ছাড়ো ‘ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সমগ্ৰ ভারতবাসী সামিল হয়েছিল সেই ‘ ভারত ছাড়ো ‘ আন্দোলনে। গান্ধীজি কারাবন্দী হয়েছিলেন। উত্তাল জনতরঙ্গে কেঁপে উঠেছিল ইংরেজ শাসনের ভীত। তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইংরেজ সরকার প্রদত্ত ‘ কাইজার - ই- হিন্দ ‘ পদক প্রত্যাখ্যান করেন। গান্ধীজি নরমপন্থী নেতা হলে ও বাস্তবে ছিলেন নির্ভীক তথা দৃঢ়চেতা। তিনি পরাধীন ভারতের স্বাধীনতার জন্য নির্দ্বিধায় একাধিকবার কারাবন্দী হয়েছিলেন।
গান্ধীজি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্ৰগামী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অন্যতম তথা আধুনিক ভারতের উজ্জ্বল তারকা। তিনি ছিলেন সত্যাগ্ৰহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, যার মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণ তাদের অভিমত ব্যক্ত করে। এ আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অহিংস মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে। এই আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি, যা সমগ্ৰ বিশ্বে মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম অনুপ্রেরণা। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বলিষ্ট প্রতিবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। ছিলেন লাঞ্চিত মানবতার মুক্তি - দূত, স্পর্ধিত রাজশক্তির অনমনীয় প্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর ছিল বিস্ময়কর সাংগঠনিক প্রতিভা। অস্পৃশ্যতাকে তিনি মনে করতেন পাপ। তাঁর ‘ হরিজন আন্দোলন’ ছিল এক নতুন ভারত গঠনের স্বপ্ন। তাই তাঁর স্বরাজ ভাবনা ও রাষ্ট্রদর্শন ছিল সকল সমালোচনার উর্ধ্বে। তাই বুনিয়াদি শিক্ষা, জাতপাত - অস্পৃশ্যতা বিরোধী আইন, সংখ্যালঘুদের অধিকার স্বীকৃতি, বিকেন্দ্রীকরণ শাসন ব্যবস্থা, স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসন ব্যবস্থা তথা পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থা সর্বত্রই গান্ধীজির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ভারত ও বিশ্ব মাঝে ‘ মহাত্মা ‘ ও ‘ বাপু ‘ হিসেবে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী খ্যাতি অর্জন করেন। ভারত সরকার ও গান্ধীজির সম্মানার্থে তাঁকে ‘ জাতির জনক ‘ উপাধিতে ভূষিত করেন। ২ রা অক্টোবর তাঁর জন্মদিন ভারতের ‘ গান্ধী জয়ন্তী ‘ হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়।২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতি সংঘের সাধারণ সভা ২ রা অক্টোবরকেই ‘ আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস ‘ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct