পাশারুল আলম, আপনজন: ভারত, একটি বহুজাতিক, বহু ধর্মীয় এবং বহু সংস্কৃতির দেশ হিসাবে পরিচিত। সংবিধানে সকল নাগরিকের জন্য সমানাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও, দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘুরা প্রায়শই বৈষম্যের শিকার হয়। ভারতীয় আদিবাসীদের জন্য প্রণীত এট্রোসিটিস্ আইন (The Scheduled Castes and Scheduled Tribes (Prevention of Atrocities) Act, 1989) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা তাদের প্রতি হওয়া অত্যাচার ও বৈষম্য প্রতিরোধে কাজ করে। এই প্রেক্ষাপটে, দেশের মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জন্যও সম অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অনুরূপ আইন প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
আদিবাসীদের জন্য এট্রোসিটিস্ আইন: একটি সফল পদক্ষেপ:
ভারতে আদিবাসী এবং দলিতদের উপর শতাব্দীকাল ধরে চলা অত্যাচার, সামাজিক বৈষম্য, এবং নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে এট্রোসিটিস্ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। এই আইনটি বিশেষভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ গুলোকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে। এতে আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি, আর্থিক ও সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে, যা আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রেক্ষাপট:
ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠী বহু ক্ষেত্রেই বৈষম্য, সহিংসতা এবং সামাজিক নিপীড়নের শিকার হয়। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়, যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক ও ধর্মীয় উস্কানি দিয়ে বিদ্বেষমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও বিভিন্ন এলাকায় ধর্মান্তরিত করণের মিথ্যা অভিযোগে আক্রমণের শিকার হন। সংখ্যালঘুদের প্রতি এই ধরনের আচরণ জাতীয় ঐক্য ও শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। যদিও ভারতীয় সংবিধান সকল নাগরিকের সমানাধিকার সুনিশ্চিত করেছে, কিন্তু বাস্তবে এই অধিকার গুলি অনেক সময় ক্ষুণ্ণ হয়।
সংখ্যালঘুদের জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের যৌক্তিকতা:
এট্রোসিটিস্ আইনের মতো সংখ্যালঘুদের জন্যও একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। এটি তাদের প্রতি হওয়া বৈষম্য, সহিংসতা, এবং সামাজিক অবিচার প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। এ ধরনের আইন:
১. সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে: মুসলিম, খ্রিস্টান সহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম হবে।
২. সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখবে: ধর্মীয় এবং সামাজিক উস্কানির কারণে সৃষ্ট সহিংসতার ঘটনা কমবে, যা জাতীয় সংহতি ও শান্তি রক্ষায় সহায়ক হবে।
৩. অপরাধীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করবে: সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকলে অপরাধীরা এমন কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে।
৪. আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন: সংখ্যালঘুদের পুনর্বাসন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যও এই আইনে ব্যবস্থা থাকতে পারে, যা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতে সহায়ক হবে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিরোধ:
তবে, এ ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সমাজের কিছু অংশে এর বিরোধিতা হতে পারে, যেখানে এটি একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান হিসেবে দেখা হবে। এছাড়া, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে। তবে, যথাযথ আইনি কাঠামো ও নজরদারি ব্যবস্থা রেখে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
উপসংহার:
ভারতের বৈচিত্র্যময় সমাজের ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখার জন্য সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসীদের জন্য যেমন এট্রোসিটিস্ আইন একটি সুরক্ষা প্রদান করে, তেমনি মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জন্যও অনুরূপ আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। এই ধরনের আইন প্রণয়ন করা হলে, সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা রোধ করা সম্ভব হবে এবং ভারত তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে।
এই দাবির স্বপক্ষে সমস্ত দলের সাংসদদের নিকট আবেদন করুন।
লেখক উত্তর দিনাজপুরের বিশিষ্ট সমাজকর্মী
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct