মিসবাহুল হক, কলকাত, আপনজন: কলকাতা হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ২২ মে রাজ্যের ওবিসি বাতিল নিয়ে যে রায় দিয়েছে তার জল অনেক দূর গড়িয়ে চলেছে। অবশ্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবেশেষে সোমবার মুখ খুলে রাজ্যের ওবিসি তালিকাভুক্ত মূলত সংখ্যালঘুদের মনে খানিকটা আস্থা সৃষ্টি করছেন। রাজ্যের সংখ্যালঘুদের কল্যাণে মুখ্যমন্ত্রী বারবার ঐকান্তিকভাবে চেষ্টা করলেও রাজ্যের এক শ্রেণির সরকারি আধিকারিক অনেক সময় মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে দেওয়া সরকারি নির্দেশিকাকেই অমান্য করছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগ আরও প্রকট হয়ে উঠেছে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের ওবিসি বাতিলের পর। এর ফলে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেডিক্যাল পড়ুয়ারা। সেই প্রামাণ্য ‘আপনজন’-এর হাতে এসেছে।
বাঁকুড়ার এক ওবিসি ( ‘কান মুসলিম’) কৃতী নিট উত্তীর্ণকে প্রথম কাউন্সেলিংয়ে অ্যালটমেন্ট লেটার দেওয়ার পরেও ভর্তি না করে ফিরিয়ে দিলেন কলকাতার এসএসএকেএম হাসপাতালের ডিন। বাতিল করা হল তার ওবিসি সংরক্ষণ সুবিধা। এ প্রসঙ্গে বাঁকুড়া সদর থানার নূতনগ্রামের বাসিন্দা মুহাম্মদ বেলাল খান দৈনিক ‘আপনজন’কে জানিয়েছেন, তার পুত্র মারুফ খান এ বছর নিট-এ ৬৭০ নম্বর পেয়েছেন। নিট-এ অল ইন্ডিয়া ব়্যাঙ্ক হয়েছে ১২৭৬৬। আর ওবিসি (এনসিএল)-এর কেন্দ্রীয় তালিকা অনুযায়ী তার ব়্যাঙ্ক ৫৩৭৯। বেলাল খান জানান, রাজ্যের স্বাস্থ্য ভবন নিয়ন্ত্রিত ওয়েস্টবেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সেলিং কমিটি আয়োজিত মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির প্রথম কাউন্সেলিংয়ে নিয়ম মেনে ফরম পূরণ করা হয়। সেই নিয়মের মধ্যে একটি ‘ওবিসি এনসিএল’ সার্টিফিকেটের ফরম পূরণের কথা বলা হয়। সেই নিয়ম মেনে নির্দিষ্ঠ সময়ের মধ্যে বাঁকুড়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ডেপুটি কালেক্টরের সই সম্বলিত ২৮ জুনের শংসাপত্র জমা করা হয়। এরপর ২২ আগস্ট রেজিস্ট্রেশন করার পর ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশনের জন্য ডাকা হয় মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে। ২৩ আগস্ট ভেরিফিকেশন করার পর ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। তারপর গত ২৭ আগস্ট ওয়েস্টবেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সেলিং কমিটি প্রথম রাউন্ডের কাউন্সেলিংয়ের তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় সব শ্রেণি মিলিয়ে মারুফ খানের স্থান হয় ৪৬৮। সেই মতো চয়েস ফিলিং ২৮ আগস্ট করা হয়। তারপর অ্যালটমেন্ট লিস্ট প্রকাশ করা হয়। এর পর ওয়েস্টবেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সেলিং কমিটি মারুফ খানের নামে অ্যালটমেন্ট লেটার ইস্যু করে জানিয়ে দেয় তার এমবিবিএসে ভর্তির জন্য নির্ধারিত কলেজ হল কলকাতার ইন্সটিটিউট অফ পিজি মেডিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চ। সেই মতো ৪ তারিখ পিজি মেডিক্যাল কলেজে গেলে অনেক ভেরিফিকেশনের পর আইপিজেএমইঅার-এর স্টুডেন্ট বিষয়ক ডিন অধ্যাপক অভিজিৎ হাজরা বলেন, মারুফ খান যেসব তথ্য জমা করেছেন তা অল ইন্ডিয়া স্টেট কোটায় মেডিক্যালে ভর্তির জন্য, রাজ্যের কোটায় নয়। নতুন করে এনসিএল সার্টিফিকেট জমা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। যদিও মারুফ খান যে এনসিএল জমা দিয়েছেন তা বাঁকুড়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ডেপুটি কালেক্টর ইস্যু করেন ২৮ জুন, ২০২৪। সেক্ষেত্রে পিজি থেকে যুিক্ত দেওয়া হয়, যে ওবিসি এনসিএল সার্টিফিকেট জমা দেওয়া হয়েছে তা পুনরায় নিয়ে আসতে হবে এসডিও অফিস থেকে। সেই মতো বেলাল খান তার পুত্রের জন্য এনসিএল সার্টিফিকেটের জন্য দরবার করেন। তখন ৪ সেপ্টেম্বর বাঁকুড়ার এসডিও অফিস থেকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, তারা কলকাতা হাইকোর্টের ২২ মে-র রায়ের কপি পেয়েছেন ২৭ জুলাই। তাই হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী আমাদের পক্ষে এনসিএল সার্টিফিকেট প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। ৫ সেপ্টেম্বর ছিল এনসিএল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। সেই সময়ে জমা দিতে না পারায় ওয়েস্টবেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সেলিং কমিটির জারি করা মারুফ খানের অ্যালটমেন্ট লেটারের উপর পিজি-র স্টুডেন্ট বিষয়ক ডিন অধ্যাপক অভিজিৎ হাজরা সই করে সিট বাতিল বলে লিখে দেন। এর পর বেলাল খান সেই লেটার নিয়ে স্বাস্থ্য ভবনের ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করেন।
তিনি ডিরক্টেরকে বলেন, যদি বাতিল করার হত তাহলে কেন সিট অ্যালটমেন্টের সময় ওবিসি সংরক্ষণ বাতিল করা হল না। তাহলে নিয়মমতো ওবিসি সংরক্ষণ বাতিল হলে সাধারণ কোটায় তা স্থানান্তরিত হত। এ বিষয়ে বেলাল সাহেব জানান, স্বাস্থ্য ভবনের ডিরেক্টর তাকে জানিয়েছেন, ডাক্তারি পড়ুয়াদের ভর্তির ব্যাপারে ডিন হচ্ছেন নোডাল অফিসার। তাই তাদের কিছু করার নেই। এরপর বেলাল সাহেব আর্জি জানান, যদি একান্তই ওবিসি সার্টিফিকেট বাতিল করা হয় তাহলে তাকে সাধারণ ক্যাটেগরি হিসেবে গণ্য করে প্রথম কাউন্সেলিংয়ে সাধারণ আসন বরাদ্দ করা হোক। ডিরেক্টর তার দাবি মানতে চাননি। বরং পরামর্শ দেন দ্বিতীয় কাউন্সেলিংয়ে জেনারেল হিসেবে আবেদন করতে। সেই মতো মারুফ আবেদন করেছেন বটে, কিন্তু এখন কোনও সরকারি কলেজে আসন পাবেন কিনা সন্দিহান। কান্না ভরা চোখে বেলাল সাহেব বলেন, প্রথমেই ওবিসি শংসাপত্র বাতিল বললে সাধারণ কোটায় আসন পাওয়া যেত। এখন প্রথম কাউন্সেলিংয়ে ওবিসি কিংবা সাধারণ— কোনও কোটায় পাওয়া গেল না নিট-এ ৬৭০ পাওয়া ছাত্র মারুফ খানের। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক বেলালের স্বপ্ন ছিল ছেলেকে ভাল কলেজে এমবিবিএসে ভর্তি করার। সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে চুরমার। সেই অন্তরের বেদনা কি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছবে সেই প্রশ্ন এখন কুরে কুরে খাচ্ছে বেলাল খানকে। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct