পাভেল আখতার
সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরণের এই যুগে লেখালিখিরও একটি অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে এটি ; ফেসবুক যার মধ্যে অন্যতম। অনেকেই ভাল লেখেনও। কিন্তু দুঃখের বিষয় হ’ল, অধিকাংশ লেখকের লেখায় ব্যাকরণগত নানা ভুলভ্রান্তি, বিশেষত বানানবিভ্রাট নিত্যদিন দেখে চোখ পীড়িত হয় ! কোথায় ‘বাধা’ হবে আর কোথায় ‘বাঁধা’ হবে--অর্থাৎ, চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার, কোথায় ‘র’ ও কোথায় ‘ড়’ হবে তা নিয়ে ব্যাপক বিভ্রাট চোখে পড়ে। এছাড়া ‘ন’, ‘ণ’ এবং ‘শ’, ‘স’, ‘ষ’--এগুলির ভুলভ্রান্তি তো আছেই। অনেক প্রাজ্ঞ ব্যক্তির লেখাতেও এ-জাতীয় ভুল আকছার দেখা যায়। জানি না, পারি না, যাব না--অনেকেই দেখি লেখেন জানিনা, পারিনা, যাবনা। অনেকেই লেখেন--’সে যাই’, ‘আমি যায়’ ! একদমই ভুল। এরকম বহু বিচিত্র সব ভুলের পাহাড়। আমরা কেউই সম্পূর্ণ নির্ভুল নই। কিন্তু নিজের মাতৃভাষা ঠিকঠাক বলতে ও লিখতে পারার অভ্যাসটা রপ্ত করার ব্যাপারে আন্তরিকতায় ঘাটতি থাকা কাম্য নয়। সেজন্য একটু জেনে নেওয়ার কষ্ট তো করতেই হবে, তাই না ?
‘এই বিষয়ে তোমার মত কী ?’ ‘তুমি তোমার মতো থাকো।’ এই দুটি বাক্যে ‘মত’ ও ‘মতো’ শব্দ দুটির বানান আলাদা। কিন্তু, অনেকের লেখাতেই ‘গোলমাল’ দেখছি। বহুদিন ধরে লিখছেন, লেখালেখি করছেন, এমন অনেকের লেখাতেও অজস্র বানান ভুল প্রায় নিত্যদিন চোখে পড়ছে। কবিতা বা ছড়াটা হয়তো কেউ খুব ভাল লিখেছেন, কিন্তু একাধিক বানান ভুল আছে। গদ্য লিখেছেন, সেখানেও একই দৃশ্য। ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক ! ‘ণত্ব-ষত্ব’র দশা তো সাংঘাতিক। সামান্য ‘গ্রহণ’ শব্দটাও ‘গ্রহন’ লিখছেন। এরকম ভুল বিপুল। বিচিত্র ধরনের ভুল। সবচেয়ে বিস্ময়কর কোনও কোনও ‘শিক্ষকের’ লেখাতেও বানান ভুল ! একজন শিক্ষক ভুল জানলে ছাত্র কী শিখবে ? একথা ঠিক যে, ফেসবুকের সৌজন্যে বাংলায় কিছু লেখার জোয়ার এসেছে এটা খুব আনন্দের বিষয়। কিন্তু, শুদ্ধ বানানের প্রতি লেখকদের আরও যত্নবান হতে দেখলে ভাল লাগত।
বাংলায় সমোচ্চারিত শব্দগুলির বানানে যে পার্থক্য আছে তা না-জানলে বিপত্তি অনিবার্য। সেক্ষেত্রে যে জায়গায় যে শব্দটা দরকার সেটা ব্যবহৃত না-হয়ে উল্টোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। সেটাই সচরাচর হয়েও থাকে। উদাহরণ দিই। নজরুল লিখলেন : ‘’কোন্ কূলে আজ ভিড়ল তরী’’--এখানে ‘কূল’ বলতে তিনি নদীতটের কথা বোঝাচ্ছেন। কিন্তু, কেউ যদি ‘কুল’ লেখে, যার অর্থ ‘বংশ’, তাহলে কবির নৌকোখানি কোথায় এসে ভিড়ছে তা ভাবা যায় ! একই উচ্চারণে একাধিক শব্দ থাকার জন্যেই তো এই পৃথক বানানের ব্যবস্থা। ‘নদীতে বান এসেছে’--এর পরিবর্তে যদি কেউ ‘বাণ’ লেখে তাহলে কেমন হয় ? আবার, ‘পাখিটার বুকে বান (হবে ‘বাণ’) মেরো না’--তাহলেই-বা কেমন হয় ? সব গোলমাল। ধরা যাক বোঝাতে চাইছি যে, লোকটার অক্ষরজ্ঞান আছে। অর্থাৎ, ‘লোকটা সাক্ষর’। কিন্তু, বলে ফেললাম, ‘লোকটা স্বাক্ষর’। তাহলে কী দাঁড়াল ? আসলে কিছুই দাঁড়াল না। কারণ, ‘স্বাক্ষর’ মানে তো ‘সই’। হায় ! ‘জানার কোনও শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’--হীরকের রাজা অবশ্য ‘অন্য কারণে’ কথাটা বলেছিল। কিন্তু, গড় বাঙালির আরাধ্য হ’ল--’অনীহা’ ও ‘আলস্য’। লিখতে গেলে কী লিখব এবং কীভাবে লিখব দুটোই জানতে হবে। অথচ এই ব্যাপারে বাঙালির ঔদাসীন্য আকাশ ছুঁয়েছে !
অবস্থা দেখে মনে এই প্রশ্ন জাগে যে, বাঙালি কি আদৌ তার ভাষাটাকে ভালবাসে ? ফেসবুকের বিভিন্ন লেখায়, নানা মন্তব্যে এত এত ভুলভ্রান্তি চোখে পড়ে যে, সেসব দেখে এই সন্দেহ বা সংশয়টাই ক্রমশ প্রবল হচ্ছে মনে। বানানে, বাক্য গঠনে নিত্যদিন অজস্র ভুল দেখে অন্তরে গভীর বেদনা অনুভব করি ! মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা থাকলে এই অপরিমেয় অবহেলা, ঔদাসীন্য কি প্রদর্শিত হওয়া সম্ভব ? অজ্ঞতা থেকে ভুল হতে পারে, কিন্তু কথা হচ্ছে, একজন মানুষ দিনের পর দিন অসংশোধিত বা অপরিবর্তিত জায়গায় থাকবেন, ভুলের সহযাত্রী হয়েই চলবেন--এ যে রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার ! অথচ, নির্মম বাস্তবতা এটাই ! এই দুঃখ, অন্তর্যাতনা রাখব কোথায় ?
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করি। অনেকেই ইংরেজি হরফে বাংলা লেখেন। তারা কি এই অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পারেন না ? বাংলা হরফে বাংলা লেখা পড়া চোখের পক্ষে আরামদায়ক। ইংরেজি হরফে বাংলা পড়তে খুবই অসুবিধা হয়। ভাষা যখন বাক্যবাহিত হয়ে পাঠকের সামনে আসে তখন পাঠক্রিয়াটি সহজতর হওয়া অভিপ্রেত। ইংরেজি হরফে লিখব কেন, যখন আমার নিজস্ব হরফ আছে ? আমরা যে বাংলায় কথা বলি সেখানে কি ইংরেজি হরফের অস্তিত্ব থাকে ? তাহলে লেখার ক্ষেত্রেই-বা থাকবে কেন ? ‘তাড়াহুড়ো’, ‘সময়ের অভাব’ এসব কোনও ‘কাজের কথা’ নয় ।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct