এম ওয়াহেদুর রহমান, আপনজন, তারুণ্যের অনাবিল আনন্দ আর বিশুদ্ধ উচ্ছ্বাসে ১৪ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বব্যাপী মহাসমারোহে পালিত হয়’ সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ কিংবা’ ভালোবাসার দিন’। এই দিনটি আবার’লাভ ডে’ অথবা লাভার্স ফেস্টিভ্যাল’ হিসেবে ও বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত। ভালোবাসার উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সহ তরুণ প্রজন্মের যুগল। উৎসবের ছোঁয়া শহরাঞ্চল অতিক্রম করে গ্ৰামাঞ্চলে ও আছড়ে পড়ে। মুঠোফোনের মেসেজ, ই - মেইল অথবা অন লাইনে চ্যাটিংয়ে পুঞ্জ পুঞ্জ প্রেম কথার কিশলয় হয়ে ওঠে পল্লবিত। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এই দিনটির নেপথ্যে রয়েছে আত্মত্যাগ বিজরিত এক রক্তাক্ত ইতিবৃত্ত। আসলে ভ্যালেন্টাইন কোনো দিনের নাম নয় একজন ব্যক্তির নাম।যিনি ছিলেন রোমের বাসিন্দা,খ্রিষ্টধর্মের যাযক ও চিকিৎসক। Advanced Oxford Learner’s Dictionary তে’Saint’শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে A person declared to be holy by the Christian Church because of her/ his qualities or good works’অর্থাৎ এমন ব্যাক্তি, খ্রিষ্টান, গীর্জা কর্তৃক যাকে তার গুনাবলী/ ভালো কাজের জন্য পবিত্র সত্তা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।আর Valentine শব্দের অর্থ ভালোবাসা নয়। খ্রিষ্টধর্মের জন্য জীবন উৎসর্গ করার কারণে তাঁকে গীর্জা কর্তৃক’Saint’বা’পবিত্র সত্তা’ঘোষণা করা হয়েছিলো।
পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে পোপ গেলাসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি কে’ভ্যালেন্টাইনস ডে’হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলেই জানা যায়’ সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মৃতি বিজড়িত আত্মত্যাগের কথা। ভ্যালেন্টাইন ছিলেন ধর্মপ্রচারক। তৎকালীন সময়ে রোমে ধর্মপ্রচার বন্দ থাকা সত্ত্বেও তিনি খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করতেন। তাছাড়া তিনি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রোমান সৈন্যদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য বিবাহের অনুষ্ঠান ও করতেন। অন্যদিকে রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লাডিয়াস বিশ্বাস করতেন যে, অবিবাহিত সৈন্যরা বিবাহিতদের চেয়ে অধিক দক্ষ। তাই তিনি রোমান সৈন্যদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন দ্বিতীয় ক্লাডিয়াসের নিষেধাজ্ঞা কে অবজ্ঞা করে গোপনে সৈন্যদের বিয়ে দিতে থাকেন। দ্বিতীয় ক্লাডিয়াস ধর্মপ্রচার মামলায় অভিযুক্ত করে ভ্যালেন্টাইন কে কারাগারে বন্দি করেন। ভ্যালেন্টাইন কারাগারে বন্দি থাকাকালীন সময়ে কারারক্ষীর এক দৃষ্টিহীন মহিলার চিকিৎসা করে চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাঁর জয়গান। ভ্যালেন্টাইনের এই জনপ্রিয়তায় দ্বিতীয় ক্লাডিয়াস ক্রোধে ফেটে পড়েন এবং তাঁকে নিশ্চিহ্ন করতেই ২৬৯ কিংবা মতান্তরে ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পূর্বে তিনি মহিলাটিকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেছিলেন।চিঠির শেষে লেখা ছিল “ Love from your Valentine”. তিনি প্রেমের জন্য নিজের জীবন কে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁরই নামানুসারে উদযাপিত হয় ভ্যালেন্টাইনস ডে। কিন্তু তবে তিনি কোন ব্যাক্তিগত প্রেমের কথা বলেন নি। ভালোবাসাকে বেঁধে দেননি নারী পুরুষের শরীরী ছন্দে। তাঁর প্রচার ও প্রসার ছিল জাতি , ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে মানবপ্রেম নিয়ে।
খ্রিষ্টানরা ১৪ ফেব্রুয়ারি’ লুপারকেলিয়া’ নামক এক ধরনের উৎসব পালন করতো। এই উৎসবের একটি অন্যতম কর্মসূচি ছিল প্রেমের দেবী’জুনু ফেব্রায়াটা’র আশীর্বাদ কামনায় যুবকদের মধ্যে যুবতীদের বন্টনের জন্য লটারির আয়োজন। প্রথানুযায়ী তারা যুবতীদের নাম লিখে একটি বাক্সে রাখত। ফলস্বরূপ যুবকেরা বাক্স থেকে নাম তুলতো। লটারিতে যে যুবকের হাতে যে যুবতীর নাম উঠে আসতো তাকে সে যুবকের সঙ্গে এক বছর লিভিং টুগেদার করতে হতো। ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি ভালোবাসা তথা অনুরাগের মাধ্যমে পালিত হলেও আসলে সেটা ছিল খ্রিষ্টধর্মের ধর্মীয় উৎসব। যদিও আজ তা বিশ্বব্যাপী প্রেম ও ভালোবাসার আনুষ্ঠানিক দিবসে পরিগণিত হয়েছে। এই দিনে চকোলেট, পারফিউম, গ্ৰিটিংস কার্ড , এস এম এস, হীরার আংটি, খেলনা, শৌখিন উপহার প্রিয়জনকে উপহার দিয়ে থাকে। এই দিনটি তে সিনেমা হল,পার্ক সর্বোপরি যে কোন বিনোদনের কেন্দ্রগুলোতে ভালোবাসার তাগিদে একে অপরের জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে। সবাই কেমন যেন ভালবাসার জয়গানে আপ্লুত হয়ে ওঠে। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে দিন ও রাত প্রেম সরোবরে ডুব দেয় অগনিত যুগল। তাছাড়া চরিত্রের নৈতিক ভূষণ খুলে প্রেম সরোবরের সলিলে হারিয়ে গিয়ে মরীচিকা বিভ্রমের দিকে ছুটে যায় অসংখ্য যুগোল। ১৪ ফেব্রুয়ারি তরুণ তরুণীরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে থাকে উন্মাদের মতো। মানুষ কেবলমাত্র নিষিদ্ধ যৌবন কামনার তাড়নায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে মনুষ্যত্বের বিবেককে। ভালোবাস দিবসের আড়ালে আজকের দিনে যা হচ্ছে তা আদৌও কাম্য নয়। ভালোবাসা কখনো কোন নির্দিষ্ট দিবস কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে না, এ হলো একটি সর্বকালীন আদর্শের বেড়াজালে আবদ্ধ মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct