সেখ মহম্মদ ইমরান, ঘাটাল, আপনজন: মাত্র তিন মাস। তারপরেই নিভে গেল কংগ্রেসের একমাত্র প্রদীপ। তৃণমূল কংগ্রেসের নবজোয়ার কর্মসূচির ৩৩তম দিনে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালে তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির হাত ধরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করলেন বায়রন বিশ্বাস। সোমবার বেলা তিনটে নাগাদ ঘাটাল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে ও তার হাতে দলের পতাকা তুলে দিয়ে তৃণমূল পরিবারে স্বাগত জানান। এই ঘটনা ঘিরে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়। তাঁর জয়ের পর বাম-কংগ্রেসের জোট থেকে উঠে এসেছিল ‘সাগরদিঘি মডেল’-এর কথা। ভেঙে চুরমার ‘সাগরদিঘি মডেল’। বায়রন বিশ্বাস বলেন, ‘আমি কংগ্রেসের মধ্যে কাজ করতে পারিনি। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে আজ আমি তৃণমূলে যোগ দিয়েছি। একমাত্র দলই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। আমি আবার নির্বাচনে দাঁড়ালে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করব। সাগরদিঘির সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করেই এই সিদ্ধান্ত।’ তাঁর কথায়, ‘‘আমি আসলে তৃণমূলেরই লোক আমি। তাদের সমর্থন না পেলে আমি এত বেশি ভোটে জিততে পারতাম না।’’ অভিষেকের পাশে বসে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘‘বরাবরই তৃণমূল করে আসছি। টিকিট পাইনি বলে কংগ্রেসে যাই।’ বাযরন আরও বলেন, ‘‘আমি কংগ্রেসের ভোটে জিতিনি। আমি আগে থেকে জনগণের কাজ করেছি। তাঁদের ভোটে জিতেছি। আবার ভোট হলে আবার জিতে প্রমাণ করব যে এটা কংগ্রেসের ভোটে জয় নয়।’’আজ যোগদান অনুষ্ঠানে সাংবাদিকেরা বায়রনকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি তো কংগ্রেসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন।’ উত্তরে বায়রন বললেন, ‘সময়ই তা বলে দেবে। সামনের নির্বাচনে আরও বেশি ভোটে তৃণমূলের টিকিটে জিতব।’তবে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ‘’আমি দল ভাঙাইনি। বায়রন নিজে এসে নবজোয়ার মঞ্চে এই ঘাটালে তৃণমূলের পতাকা হাতে নিয়েছে। আমি দল ভাঙাতে চাইলে সাগরদিঘিতে দাঁড়িয়েই বায়রন বিশ্বাসকে যোগ দেওয়াতাম। কিন্তু আমি সেটা করিনি।’’
অভিষেক জানান, ‘’সাগরদিঘিতে জয়ের পর বহুবারই আমার সঙ্গে বায়রনের দেখা হয়েছে। আমি যেহেতু জনসংযোগ যাত্রায় রয়েছে। সেখানেও বিভিন্ন ক্যাম্পে আমার সঙ্গে ওঁর দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে।’’ উল্লেখ্য, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সাগরদিঘি আসনে উপনির্বাচন হয়। এর পর গত ২ মার্চ সাগরদিঘির ফল ঘোষণা হয়। ওই আসনে বাম কংগ্রেসের জোট প্রার্থী হিসেবে বায়রন বিশ্বাস বিপুল পরিমাণ ভোটে হারিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসকে। ২২,৯৮৬ ভোটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরবর্তী আত্মীয় তৃণমূলের দেবাশীষ ব্যানার্জিকে পরাজিত করেন। জেতার পর বলেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন অধীর থেকে সুজন সকলেই। কিন্তু উচ্ছ্বাস টিকল না। ২০২১ সালে বিধানসভায় শূন্য হয়ে যাওয়া কংগ্রেস বায়রনের হাত ধরে আবার বিধানসভায় প্রবেশ করেছিল। জয়টিকে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-বাম জোটের জন্য একটি বড় উৎসাহ হিসাবে দেখা হয়েছিল, যা পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছিল। সাগরদিঘি, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটের ৬৪শতাংশ রয়েছে। সাগরদিঘির ফলাফলটি টিএমসি-র জন্য একটি ধাক্কা হিসাবে দেখা হয়েছিল, কারণ এটি ছিল টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর দলটি হেরে যাওয়া প্রথম উপনির্বাচন। কয়েকদিন পর মন্ত্রী গোলাম রব্বানীকে সরিয়ে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের দায়িত্ব নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।কিন্তু সেই বায়রনও যোগ দিলেন তৃণমূলে। বিধানসভায় আবার ‘শূন্য’ কংগ্রেস। এ প্রসঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরি বলেন, বায়রন একজন পাকা কংগ্রেস রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তবে সাগরদিঘির ফলাফল একটি জিনিস প্রমাণ করেছে কংগ্রেস তৃণমূলকে হারাতে পারে। অধীর বলেন,কংগ্রেস বায়রনকে সুযোগ দিয়েছে। কংগ্রেসকে বেছে নেওয়ার জন্য আমরা সাগরদিঘির জনগণকে ধন্যবাদ জানাই। যদিও অধীরের অভিযোগ, সারা ভারত জানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে পার্টি ভাঙেন। অভিষেক ব্যানার্জি অধীরের অভিযোগের জবাবে বলেন, আমরা দল ভাঙতে বিশ্বাস করি না, আমরা দল গড়তে বিশ্বাস করি”। তবে, একটা জিনিস পরিষ্কার সাগরদিঘির মানুষ যে বিশ্বাসে ভর করে বায়রনকে ভোট দিয়েছেন তা ভঙ্গ হয়েছে।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct