ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে বোমা ছোড়ার মধ্য দিয়ে যে বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরির নীলনকশা করে রাশিয়ান বাহিনী, তা আজ ব্যর্থতায় পর্যবসিত। এই বছরের শুরুর দিক থেকেই দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনে থেমে থেমে রাশিয়ান বাহিনীর আক্রমণ চলছে বটে, কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থই বলতে হয়। রাশিয়ান সেনাদের কৌশল খুব একটা কাজে আসছে না। রুশ সেনা বহরে লাশের সারি ক্রমাগতভাবে দীর্ঘতর হচ্ছে! বর্তমান ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখেছেন পিটার ডিকিনসন। আজ প্রথম কিস্তি।
ভাব্যর্থতার গ্লানি দূর হয়নি বন্ধু শিকে কাছে পেয়েও! অর্থাৎ, পরিষ্কার হিসাব—বেলারুশে পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন পুতিন, তা যে তার হতাশার বহিঃপ্রকাশ—এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই! প্রতিবেশী বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আবারও ‘পারমাণবিক ভীতি’ প্রদর্শনের রাস্তায় নেমেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুংকার দিয়ে আসছেন তিনি। এই ধারাবাহিকতায় কয়েক দিন আগে মিত্র দেশ বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা দেন তিনি। এ নিয়ে স্বভাবতই ভীতি ছড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু আসল সত্য হলো, পুতিনের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের এ হুমকি পশ্চিমা নেতাদের ভয় দেখানো ছাড়া আর কিছুই নয়। পশ্চিমা বিশ্বের ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্যই এ ‘ইদুর-বিড়াল খেলা’র পথ ধরেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হতাশা থেকেই যে পুতিন এ ধরনের ঘোষণা দিয়ে বসেছেন, তা আর নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই! এমনকি রাশিয়ার হাতে যে খুব একটা ‘বিকল্প’ নেই, তা-ও এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন করে প্রমাণিত হল। বর্তমানে সবার জানা, গত বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে পুতিন লাগাতার পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের আশ্রয় নিয়ে চলেছেন। আক্রমণ শুরুর প্রথম দিক থেকেই রুশ পারমাণবিক বাহিনীকে ‘বিশেষ সতর্ক’ অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে ঘোষণা করতে থাকেন তিনি। এর পেছনে উদ্দেশ্য, পারমাণবিক ভীতি ছড়িয়ে পশ্চিমা শক্তিকে ধন্দে ফেলে যুদ্ধের ময়দানে ফায়দা হাসিল করা। যদিও কিছুদিন পরই পুতিনের এ ‘চোর-পুলিশ খেলা’ ধরে ফেলেন সবাই। বিভিন্ন পক্ষ ভালোমতোই বুঝতে পারে, পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে থামানোর প্রচেষ্টা হিসেবেই পুতিনের এই ভ্লামি, ধাপ্পাবাজি! আমরা দেখেছি, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পুতিনের মুখ থেকে অনবরত ‘পারমাণবিক হুমকি’ আসতে থাকে। এর পেছনে পুতিনের উদ্দেশ্য ছিল, পশ্চিমা পক্ষকে চাপে রেখে রাশিয়ান বাহিনীর আক্রমণ বাড়ানো। সে সময় যুদ্ধবাজ পুতিনকে বারংবার ‘বিধ্বংসী অস্ত্র’ ব্যবহার করার ঘোষণা দিতে দেখা গেছে। যুদ্ধে জিততে ‘সম্ভাব্য প্রতিটি উপায়’ ব্যবহার করা হবে বলেও প্রচার করতে দেখা গেছে তাকে। বস্তুত, যুদ্ধক্ষেত্রে করুণ অবস্থা ও রাশিয়ান সেনাদের লজ্জাজনক পশ্চাদপসরণ ঢাকতেই এ বৃথা প্রচেষ্টায় অবতীর্ণ হন পুতিন, যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত।
শুধু এবার নয়, শুরু থেকেই পুতিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছেন—‘আমি ধোঁকা দিচ্ছি না। রাশিয়ার ভূখণ্ডকে (সার্বভৌম ইউক্রেনকে নিজের অংশ মনে করে রাশিয়া) মুক্ত করতে নিজের সব শক্তি নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে ক্রেমলিন।’ যাহোক, নতুন করে পারমাণবিক ভীতি ছড়ানো পুতিনের কাছে যুতসই বিকল্প নেই। পরিষ্কার হিসাব হলো, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে বেশকিছু মিত্র দেশ। কিয়েভকে অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক যুদ্ধ ট্যাংক ও জেট ফাইটার সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে পশ্চিমা মিত্ররা। বলা বাহুল্য, এতে বেশ চাপে পড়ে গেছেন পুতিন। মূলত এ কারণেই তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন। সম্প্রতি ইউক্রেনকে অ্যান্টি-ট্যাংক গোলাবারুদ সরবরাহ করার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন। এ সিদ্ধান্তকে ‘রেড লাইন অতিক্রম করার শামিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন পুতিন, যা তার নতুন বাহানা ছাড়া আর কিছুই নয়। এদিকে, ইউক্রেনে কোণঠাসা অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে পারছে না রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। রুশ বাহিনীর ক্রমাবনতি অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে বোমা ছোড়ার মধ্য দিয়ে যে বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরির নীলনকশা করে রাশিয়ান বাহিনী, তা আজ ব্যর্থতায় পর্যবসিত। এই বছরের শুরুর দিক থেকেই দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনে থেমে থেমে রাশিয়ান বাহিনীর আক্রমণ চলছে বটে, কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থই বলতে হয়। এ দাবির পেছনে যুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে পোস্ট করা ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ান সেনাদের কৌশল খুব একটা কাজে আসছে না। রুশ সেনাদের নিয়মিত প্রাণহানির চিত্রও লক্ষ করার মতো—রুশ সেনা বহরে লাশের সারি ক্রমাগতভাবে দীর্ঘতর হচ্ছে! সামনের দিনগুলোতে রাশিয়ান সেনাদের ঘুরে দাঁড়ানোর তেমন একটা সম্ভাবনাও চোখে পড়ে না। কারণ, ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা শক্তির সাহায্য-সহযোগিতা বাড়ছেই। তাছাড়া ইউক্রেনের প্রতি গণতান্ত্রিক বিশ্বের প্রতিশ্রুতি ও সমর্থনও ক্রমশ বাড়ছে, যা জেলেনস্কিকে আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী করে তুলছে। মাস দুয়েক আগে জেলেনস্কি লন্ডন, প্যারিস ও ব্রাসেলস সফরে গেলে বীরোচিত অভিবাদন পান। এর কয়েক সপ্তাহ পর স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেন সফর করে ইউক্রেনীয়দের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে নিজের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। গত মাসের মাঝামাঝি আরো বড় ধাক্কা খায় রাশিয়া।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct