২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, রাশিয়া যদি এই যুদ্ধে হার মেনে নেয় তাহলে কেবল রাশিয়ান ফেডারেশনই নয় বরং রুশ জাতিই ভেঙে পড়তে পারে। তখন মস্কো এবং পশ্চিম উভয়পক্ষের ভাষ্যকাররাও ধারণা করেছিলেন যে, পুতিন নিজের কথা বলার পরিবর্তে একটি প্রচারণার অনুশীলনই আসলে করছিলেন। তারা মনে করেন না যে, ইউক্রেনে হেরে গেলেও রাশিয়া ভেঙে পড়বে এবং পুতিনও সেইভাবে চিন্তা করেন। রাশিয়া যদি সত্যিই হেরে যায় তার পরিণাম নিয়ে লিখেছেন মাসুম খলিলী।
ইউক্রেন যুদ্ধ এমন এক জটিল সময়ে প্রবেশ করেছে যে কোনোভাবেই এই যুদ্ধ বিজয় অর্জন করা ছাড়া বন্ধের কথা ভাবতে পারছেন না পুতিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন তিনি এটা ভাবতে পারছেন না যেখানে এই যুদ্ধ থেকে রাশিয়ার যা অর্জিত হয়েছে তার চেয়ে ক্ষতির হিসাব দৃশ্যত অনেক বড়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, রাশিয়া যদি এই যুদ্ধে হার মেনে নেয় তাহলে কেবল রাশিয়ান ফেডারেশনই নয় বরং রুশ জাতিই ভেঙে পড়তে পারে। তখন মস্কো এবং পশ্চিম উভয়পক্ষের ভাষ্যকাররাও ধারণা করেছিলেন যে, পুতিন নিজের কথা বলার পরিবর্তে একটি প্রচারণার অনুশীলনই আসলে করছিলেন। তারা মনে করেন না যে, ইউক্রেনে হেরে গেলেও রাশিয়া ভেঙে পড়বে এবং পুতিনও সেইভাবে চিন্তা করেন (Polit.ru, নভেম্বর ২৫, ২০২২)। কিন্তু এখন বিষয়টি সেরকম মনে হচ্ছে না। পুতিন আসলেই বিশ্বাস করেন যে, রাশিয়ার এই যুদ্ধে জয় ছাড়া নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিকল্প কোনো সুযোগ নেই। আর রাশিয়ার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীও সেই ধারণার সাথে দ্বিমত পোষণ করে না। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে রুশ প্রেসিডেন্টের প্রতি নানা ধরনের দুর্ভোগের পরও ব্যাপক জনসমর্থন সেটিরই ইঙ্গিত দেয়। লেভান্ডা, রাশিয়ান ফিল্ডের প্রকাশ করা এই জনমত জরিপে দেখা যায়, ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘বিশেষ অভিযান’কে সমর্থন করেন কি না মর্মে প্রশ্নের জবাবে ৮০ শতাংশ রাশিয়ান হ্যাঁ-সূচক জবাব দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৫ শতাংশের বেশি দৃঢ়তার সাথে এই সমর্থন জানিয়েছেন। অন্য দিকে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন মাত্র ১৫ শতাংশ রাশিয়ান। বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিয়েভে আবার নতুন কোনো রাশিয়ার সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ৫৯ ভাগ জানিয়েছেন, হ্যাঁ। ২৬ শতাংশ রাশিয়ান নতুন করে হামলার বিরোধিতা করেছেন। পুতিনের শর্তে শান্তি চুক্তিতে সমর্থন জানিয়েছেন ৬৬ শতাংশ আর ২৪ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। (geopoliticalfutures.com/russians-attitudes-toward-the-war, ৩ মার্চ ২০২৩) জনমত জরিপের এই প্রবণতায় বয়স বা আয় নির্বিশেষে রাশিয়ানদের মধ্যে মনোভাবের বড় ধরনের কোনো পার্থক্য দেখা যায় না।
সাধারণভাবে দেখা যায়, শাসকদের ধরন যাই হোক না কেন অভ্যন্তরীণ জনমত যুদ্ধের মতো কোনো বিষয়ে জড়িত হওয়া বা তা বন্ধ করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাশিয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের আরোপিত বিধিনিষেধের পরও যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে পুতিনের প্রতি এই ব্যাপক সমর্থন রাশিয়াকে অদূরভবিষ্যতে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে নেতিবাচক কোনো শর্ত মানতে বাধ্য করবে এমনটি মনে হয় না। একসময় প্রচারণার স্বার্থে রাশিয়া ভেঙে যাবার কথা পুতিন বলছেন বলে বিশ্বাস করার নানা কারণ ছিল। এ ধরনের ধারণার অন্যতম কারণ হল, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায় রাশিয়া এখন অনেক বেশি জাতিগতভাবে সম-মনোভাবাপন্ন এবং এখন যেকোনো বিচ্ছিন্নতার জন্য জাতিগত রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে অ-রাশিয়ানদের পরিবর্তে রাশিয়ানদের সেট করতে হবে (Vz.ru, ১৩ জুলাই, ২০২২)। মিখাইল গর্বাচেভ শেষবার যখন দেশের ভবিষ্যতকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয় তখন ক্রেমলিন রাশিয়ান ফেডারেশনের সীমানার মধ্যে অ-রুশদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেয় (Holod.media, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩)। উপরন্তু, এমনকি বেশির ভাগ রাশিয়ান বিরোধী দলও দেশটির মধ্যে যেকোনো বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে রয়েছে আর তারা সতর্ক করে দেয় যে, এই ধরনের লক্ষ্য ঘোষণা করা হবে তাদের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক (Echofm.online, মার্চ ১, ২০২৩)। তদুপরি, রাশিয়ানদের মধ্যে যারা পুতিন এবং ইউক্রেনে তার যুদ্ধের বিরোধিতা করেন তাদের মধ্যেও দেশের সম্ভাব্য ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে (Business-gazeta.ru, জানুয়ারি ৩, ২০২৩)। প্রকৃতপক্ষে, তাদের মধ্যে অনেকেই এবং অন্যরাও দীর্ঘদিন ধরে পুতিনকে সমর্থন করেছেন কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে, তিনি চেচনিয়ায় তার নৃশংস যুদ্ধের মাধ্যমে দেশের সম্ভাব্য ভাঙনের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন (Graniru.org, এপ্রিল ১৫, ২০২২)।
এভাবে পুতিনের কাছে যথেষ্ট কারণ রয়েছে, রাশিয়া এবং রুশ জাতির বিচ্ছিন্নতার আভাসকে উত্থাপন করার ক্ষেত্রে এটিকে প্রচারের একটি হাতিয়ার হিসাবে নেয়ার যাতে তিনি নিজের প্রতি এবং তার নীতিগুলোর প্রতি জনগণের সমর্থন অর্জন করতে পারেন। বিশেষত যখন এ জাতীয় ধারণাগুলোকে পশ্চিমা নীতির লক্ষ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয় তখন তিনি এই কৌশল নিতে পারেন বলে মনে করা হয়। আর বাস্তবেও এটি নিশ্চিত যে, রুশ নেতা তার মন্তব্য করার সময় এসব বিবেচনা করেছিলেন। তবে একই সময়ে, রাশিয়ান ভাষ্যকার আলেক্সান্ডার স্কোবভের মতে, বাস্তবতা হলো, পুতিন পূর্ববর্তী রাশিয়ান শাসকদের থেকেও বেশিভাবে আশঙ্কা করেন যে, ইউক্রেনে হার বা সেখান থেকে দূরে সরে আসা হবে ‘একটি অতল গহবর’ যা তার শাসনকে ছাপিয়ে যাবে এবং সাম্রাজ্যিক কাঠামো হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিতভাবে ভেঙে পড়তে পারে এতে। স্কোবভের বিশ্লেষণে বলা হয় যে, অন্যান্য সাম্রাজ্যের মতো, রাশিয়ান সাম্রাজ্য সর্বদা বিভিন্ন অঞ্চল এবং জনগণের সংমিশ্রণ ছিল। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এটিকে একত্রিত রাখা হয়েছে। একটি ‘উল্লম্ব’ প্রশাসনের অধীনস্থ করার জন্য, এর শাসক শ্রেণী সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের মধ্যে আনুভূমিক সম্পর্কের স্বাভাবিক উত্থানে (Kasparov.ru, মার্চ ৬)। তবে একই সাথে রাশিয়ান জাতিকে অন্য সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বোধ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাশিয়ান রাষ্ট্রের এই সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র এবং সামাজিক সম্পর্কের পুরো ব্যবস্থায় প্রসারিত কর্তৃত্ববাদী ঐতিহ্যের জৈব সংযোগ সুস্পষ্ট এবং এটি রাশিয়ান ব্যবস্থাকে ‘পশ্চিমাবাদ বিরোধী’ হিসাবে তৈরি করতে সহায়তা করে। পুতিনের মস্তিষ্ক হিসাবে খ্যাত আলেক্সান্ডার ডুগিন এটিকে একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছেন তার ইউরেশিয়া মতবাদের ধারণায়। এখন রাশিয়ার তাত্ত্বিকরা ও নেতৃত্ব দু’পক্ষই মনে করে, রুশ রাষ্ট্র ও জাতি উভয়ের জন্য পশ্চিম হুমকিস্বরূপ। এর ফলস্বরূপ, রাশিয়া অনায়াসে ‘অবরোধিত দুর্গ’ হওয়ার অবস্থা থেকে ‘একটি ক্রুসেড’-এর দিকে চলে যায় যাকে ‘পাপী ও মন্দ পশ্চিম’কে ধ্বংস করার লক্ষ্যে একটি নীড় হিসাবে দেখা হয় (Kasparov.ru, মার্চ ৬, ২০২৩)। আর এইভাবে, রাশিয়ান অভিজাতরা স্বাভাবিকভাবেই একটি দুষ্ট বৃত্ত তৈরি করে সেই বিপদের মোকাবিলা করতে চায়, যেখানে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় কর্তৃত্ববাদ এবং পাশ্চাত্য-বিরোধিতা উভয়কেই শক্তিশালী করে। আর সেই ধরনটার অর্থ হলো : ‘একটি রাশিয়ান সাম্রাজ্য উদার হতে পারে না এবং এটি পশ্চিমা সভ্যতার বা সম্প্রদায়ের অংশ হতে পারে না।’
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct