আপনজন ডেস্ক: কলকাতায় অ্যাডিনো ভাইরাস ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ তীব্র হচ্ছে। আজ রোববার সকাল থেকে বেলা একটা পর্যন্ত কলকাতার বিসি রায় সরকারি শিশু হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জ্বর ও শাসকষ্টসহ একাধিক উপসর্গ নিয়ে এসব শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যদিও একটি শিশুর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে অ্যাডিনো ও নিউমোনিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে, মৃত শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করা হয়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পর্যাপ্ত শিশুশয্যা নেই। বাধ্য হয়ে অনেক সংকটাপন্ন শিশুকে সাধারণ বেডে রাখতে হচ্ছে। রবিবার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গাইঘাটা এলাকার ৬ মাসের শিশুর মৃত্যু হয় বি সি রায় হাসপাতালে। শিশুটির নাম জেসমিন খাতুন। জ্বর নিয়ে ১১ দিন ধরে ভর্তি ছিল বি সি রায় হাসপাতালে। রবিবার সন্ধ্যায় অ্যাডিনোর সঙ্গে লড়ায়ে হার মানল ছোট্ট শিশুটি। বি সি রায় হাসপাতালের আইসিসিইউ-এ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জেসমিন। অ্যাডিনো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েই তার মৃত্যু হয়ে বলে দাবি তার দাদুর। যদিও বি সি রায়ের ডাক্তারদের দাবি, অ্যাডিনো ভাইরাস, নিউমোনিয়া ও আরও একটা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল জেসমিন। কিন্তু নিউমোনিয়াতেই তার মুত্য হয়। জেসমিনের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই জ্বরে ভুগছিল ছোট্ট জেসমিন। প্রথমে তাকে বনগাঁ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দিন ছয়েক থাকার পর জ্বর কমলে বাড়ি ফিরে আসে। বাড়িতে আসার দু-দিন পর ফের জ্বরে কাবু হয় জেসমিন। তখন ফের বি সি রায় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করান তাঁরা। জেসমিনের দাদুর অভিযোগ, হাসপাতালের সিসিইউ প্রথমে খালি ছিল না। তাই জেনারেল বেডেই ভর্তি করা হয়েছিল। পরে সিসিইউতে স্থানান্তরিত করা হয়। কয়েকদিনের চিকিৎসায় বেশ সুস্থও হয়ে উঠছিল জেসমিন। কিন্তু, দিন দুয়েক আগে ফের জেসমিনের অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। এদিন মেটিয়াবুরুজ সংলগ্ন নাদিয়াল থানা এলাকার বাসিন্দা আতিফা খাতুনের মৃত্যু হয়েছে। মিনাখাঁ থানার অন্তর্গত চৈতল এলাকার এক শিশুও মারা গিয়েছে। নাম আরমান গাজি। তারপর থেকে একের পর শিশু মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসছে। সবার পরিচয় জানা যায়নি। গত শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত বিসি রায় শিশু হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিগত দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গে ৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বিসি রায় শিশু হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে ৩৯ শিশুর। তবে এসব শিশুর মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট নয়। এদিকে চিকিৎসকেরা বলছেন, কিছুদিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ শুধু অ্যাডিনোর জন্য হচ্ছে তা নয়, যেকোনো ভাইরাস সংক্রমণে সেটা হতে পারে। এ ছাড়া বেশ কিছু শিশুর আগে থেকে অন্যান্য অসুস্থতা (কোমরবিডিটি) ছিল। এদিকে অ্যাডিনো ভাইরাস পরীক্ষার কিটের অভাব দেখা দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিগগিরই অ্যাডিনো পরীক্ষার পর্যাপ্ত কিট পাওয়া যাবে।
মেয়র ফিরহাদ হাকিম এ নিয়ে রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, নিউমোনিয়ায় ২৪ ঘন্টায় আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দু’মাসে বেশ কয়েকজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটা সবার হচ্ছে। সারা দেশে হচ্ছে। রাজ্য সরকার এই ব্যাপারটা খুব সিরিয়াসভাবে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে এটা নিয়ে মিটিং করছেন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। গরম পড়ায় নিউমোনিয়া বা আমাদের যে অ্যাডিনো ভাইরাসের প্রকোপটা কমে এসেছে। জ্বর, সর্দি–কাশি ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। প্রতিদিনই কলকাতার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসব উপসর্গ নিয়ে রোগীদের ভিড় বাড়ছে। ভিড় বেশি বেলেঘাটার আইডি হাসপাতাল, মানিকতলার বিসি রায় শিশু হাসপাতাল ও কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত বুধবার এই ভাইরাসে সংক্রমিত পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বিসি রায় শিশু হাসপাতাল এবং কলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরদিন বৃহস্পতিবার মারা গেছে আরও পাঁচ শিশু। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত এই ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।ভাইরাসটির প্রকোপ মোকাবিলায় রাজ্য সরকার বিসি রায় শিশু হাসপাতালে ৭২টি এবং বেলেঘাটার আইডি হাসপাতালে ৫০টি অতিরিক্ত শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে কলকাতার সব বড় হাসপাতালে শিশুদের চিকিৎসার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। বিজেপির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি দিলীপ ঘোষের অভিযোগ, রাজ্য সরকার ভাইরাসটির প্রকোপের তথ্য গোপন করছে। অবিলম্বে এই ভাইরাস পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কিটের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct