UNESCO র আলোকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
সজল মজুমদার
পৃথিবীর যেকোনো জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যতার পরিচায়ক হচ্ছে তার মাতৃভাষা। প্রত্যেকটি আঞ্চলিক জাতির কাছে নিজস্ব মাতৃভাষা বিরাট গর্ব ও গরিমা বহন করে চলে। প্রসঙ্গত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস ও পটভূমি প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারির দিনেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তান বা অধুনা বাংলাদেশে শুধুমাত্র সেখানকার রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’ কে পূর্ণ প্রতিস্থাপন করবার দাবিতে আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, শফিউর, রফিক, আব্দুল জব্বার এর মতো অসংখ্য পড়ুয়ারা এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে সেদিন সামিল হয়েছিল, পরবর্তীকালে দুই বাংলা ভিন্ন হয়ে গেলেও দুটি স্থানের একই মাতৃভাষা ,বাংলা সংস্কৃতির সেতুবন্ধনকারী হিসেবে আজও স্ব মহিমায় এগিয়ে চলেছে। এপার বাংলা, ওপার বাংলার মানুষদের কাছে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব আজও কম বেশি সকলেরই হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। তবে শুধু বাংলাভাষী বলে নয়, UNO এর সহযোগী সংগঠন UNESCO সেই ১৭ই নভেম্বর, ১৯৯৯ সাল থেকেই বিশ্বের সকল জাতির মাতৃভাষাকে সম্মান জানিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে যথাযোগ্য মর্যদায় সর্বত্র পালন করে এসেছে। এমনকি ভারতীয় সংবিধানের শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারাগুলোতেও মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। জানলে অবাক লাগে, সারা বিশ্বে ৫০০০ থেকে ৭০০০ রকমের ভাষা রয়েছে। এত সংখ্যক ভাষার অনেকাংশই বোধগম্যজনিত সমস্যাযুক্ত। আবার অনেক ভাষা যথেচ্ছ ভাবে চালু না থাকার কারণে বিলুপ্তি এবং অস্তিত্ব সংকটের দিকে পা বাড়িয়ে রয়েছে। ২০১৮ সালে UNESCO এর একটি রিপোর্ট অনুসারে আমাদের দেশেই ৪২ ধরনের আঞ্চলিক ভাষার অস্তিত্ব বিলুপ্তির দিকে রয়েছে। তথাপি UNESCO এর মতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণে বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। ঠিক সেই কারণেই সকল ভাষাকেই গুরুত্ব দিয়ে UNESCO প্রতিবছর এই দিনটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক, বিষয় ভিত্তিক, বা থিম ভিত্তিক হিসেবে পালন করে আসছে।যেমন সাম্প্রতিক 2021 সালে UNESCO আয়োজিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের থিম ছিলো,’ শিক্ষা এবং সমাজ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির জন্য বহুভাষা বাদ (multilingualism) প্রতিপালন ‘। তেমনি ২০২২ সালের থিম ছিলো , ‘ বহুভাষা শিখনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা: সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা। একই রকম ভাবে এই বছরের UNESCO এর থিম তথা স্লোগান হলো ,’ বহু ভাষা শিক্ষা: বর্তমান পরিবর্তনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় এটির প্রয়োজনীয়তা।’ অর্থাৎ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বহুভাষা বাদ বা multilingualism কে প্রাধান্য দিয়ে হারিয়ে যেতে বসা, বিশ্বব্যাপী আঞ্চলিক ভাষা সমূহের পুনর্জীবন ঘটানো, সকল দেশের শিক্ষা নীতিতে বহু ভাষা শিক্ষায় শিক্ষাপ্রদানের মাধ্যমকে আরো শক্তিশালী করা, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে রক্ষা করা। উদাহরণস্বরপ, বহুল প্রচলিত রাষ্ট্র ভাষা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা চর্চার পাশাপাশি বহু ভাষাভাষী আমাদের দেশে বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর পুনরুদ্ধার, গবেষণা, সমীক্ষা, নথিবদ্ধকরন, প্রসারিতকরন, উৎসাহ প্রদান বর্তমানে অত্যন্ত জরুরী। তাই আসুন,এবারের মাতৃভাষা দিবসে নিজের মাতৃভাষাকে আরো শক্তিশালী, বলিষ্ঠ করবার পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা অন্যান্য জাতির মাতৃভাষাগুলোকেও রক্ষা করার জন্য UNESCO এর দেখানো পথে সকলে এগিয়ে চলি।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct