নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর পড়ুয়াদের জন্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার খুব শীঘ্রই হয়তো “হেল্থ প্যাকেজ” নামে একটা নতুন প্রকল্প চালু করতে চলেছে। এটা একটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘অভিনব’ উদ্যোগ নামেও অভিহিত করা হচ্ছে। এই নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য আনুমানিকভাবে বলা যেতে পারে যে পুষ্টির সঠিক যোগান দেওয়া। কেননা এই বয়সে শারীরবৃত্তীয় বিভিন্ন পরিবর্তন আসে, যেটা মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। সেই অর্থে, এই প্রকল্প খুব প্রশংসিত এবং খুব ভালো একটা উদ্যোগ বলা যেতে পারে যদি শুরু হয়। তা নিয়ে লিখেছেন মোঃ সাহিদুল ইসলাম।
নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর পড়ুয়াদের জন্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার খুব শীঘ্রই হয়তো “হেল্থ প্যাকেজ” নামে একটা নতুন প্রকল্প চালু করতে চলেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খুশির জোয়ার এসেছে এবং এটা একটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘অভিনব’ উদ্যোগ নামেও অভিহিত করা হচ্ছে। এই নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য আনুমানিকভাবে বলা যেতে পারে যে পুষ্টির সঠিক যোগান দেওয়া। কেননা এই বয়সে শারীরবৃত্তীয় বিভিন্ন পরিবর্তন আসে, যেটা মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। সেই অর্থে, এই প্রকল্প খুব প্রশংসিত এবং খুব ভালো একটা উদ্যোগ বলা যেতে পারে যদি শুরু হয়। কিন্তু উদ্দেশ্য নিয়ে যদি চিন্তা করি তাহলে অনায়াসে কয়েকটি সংশয় মনে উঁকি মারে: ১. নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী অর্থাৎ ১৫ বছর বয়স থেকে ১৮ বছর বয়স এর মধ্যে পরে, যাঁরা পরবর্তী মত্দান নাগরিকের অধিকার পাবে, ২. স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিক থেকে ভাবলে শুধু মাত্র এই শ্রেণীর ছেলে-মেয়েরাই নয় বরং সমস্ত শ্রেণীসহ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারাই এর অন্তর্ভুক্তি হতে পারে, ৩. অন্যদিকে, সম্প্রতি জন-অনুমানিকতার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১১ কোটির বেশি জনগণ বসবাস করে সেখানে প্রবীণ জনগণ প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি, এবং তাঁদের স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থা যে কি সেটা আর বলার প্রয়োজন রাখে না এবং তাদের জন্যে সরকারের বিশেষ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারের এই পদক্ষেপ খুব সংকীর্ণ পরিকল্পনার পরিচয় দিচ্ছে যেখানে আমাদের রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পরিকাঠামোর অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং অন্যান্ন ব্লক স্তরে গ্রামীণ হাসপাতালগুলির যে কি শোচনীয় অবস্থা, তা নিয়ে সকলেই ওয়াকিবহাল। আরো স্পষ্ট করে বললে, মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পরেও হৃদরোগ বিভাগ নেই, যার জন্যে অগণিত রুগীকে চিকিৎসার জন্যে দেশান্তরে পাড়ি দিতে হয়। সম্প্রতি, দুয়ারে সরকারের ধাঁচা কে অনুসরণ করে ‘বাংলা উন্নয়ন মডেল’ নামে নতুন অভিযান শুরু করতে চলেছে। কিন্তু আমাদের রাজ্যের প্রকল্প রূপায়ণকারীদের এই মডেলের একটা সর্বাঙ্গীন ‘এভিডেন্স’ সহ ফলাফলটা যাঁচাই করা উচিত। ‘বাংলা মডেল’ এর মূল ভিত্তি হওয়া উচিত বাংলার জনগণের সন্তুষ্টির প্রতিক্রিয়া বা বিরূপতা কতটা বা কেন ? এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেয়, সরকার বা “দিদি-সরকার” বিভিন্ন স্বল্প মেয়াদি মিশন-মোড প্রকল্প নিয়ে জনগণের দুয়ারে পৌঁছে মানুষের সাথে সরাসরি সেতু তৈরি করতে চাইছে কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই সেতু সত্যিই কি খুব মজবুত হচ্ছে? এক দিকে রাজ্যে একটার পর একটা দুর্নীতি জন-সমক্ষে উঠে আসছে , অন্য দিকে দিদি-সরকার মানুষের কাছাকাছি আসতে চাইছে, তাহলে কি ‘দিদি’, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বুদ্ধিজীবীমহল সহ বিশ্বদরবারে হাসির পাত্র হয়ে উঠছে না?
বেশ কয়েকবছর থেকে এটা খুব স্পষ্ট যে, যুব সম্প্রদায় সহ সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর মানুষ সরকারে প্রতি ‘বিশ্বাস’ হারিয়ে ফেলেছে বা ফেলছে। বিশ্বাসটা ভঙ্গুর হওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে সামাজিক ‘ন্যায় ও শৃঙ্খলা’ বজায় রাখতে অসমর্থ্য সরকার। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন রাষ্ট্র-বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, ও সমাজবিজ্ঞানী তাঁদের গবেষণার মাধ্যমে প্রমান করে দেখিয়েছেন যে বিশ্বাস (Trust) কিভাবে ‘সরকার ও জনগণের’ মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে এবং সুস্থ সমাজ ও দেশ গড়ে উঠতে সহায়ক । যাইহোক,এটা অবশ্যই সকলকে স্বীকার করতেই হবে, দিদি-সরকার সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর মানুষের জন্যে প্রকল্প ও পরিকল্পনা অবিরাম করে চলেছে বিভিন্ন প্রকল্প অভিযানের মাধ্যমে। যেমন কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সমব্যথী থেকে শুরু করে জীবনজীবিকা প্রকল্প সহ কর্মতীর্থ প্রতিষ্ঠা। এই নিরিখে নিঃসন্দেহে, দেশের ভিন্ন রাজ্যের তুলনায় আমাদের রাজ্য বেশ প্রশংসিত হওয়া সত্ত্বেও, কোথাও না কোথাও সরকারের প্রতি জনগনের অসন্তুষ্টি ও বিরূপতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ অর্থ খরচ করে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করা সত্বেও, সমাজের বৃহদাংশ উন্নয়ন মূলক প্রকল্পের আওতায় আসতে পারছে না এবং বৃহৎ আকারে সমাজে উন্নতির প্রভাব অস্পষ্ট। এই বৈপরীত্য প্রকৃতির জন্যে বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে যেগুলিকে প্রকল্প রূপায়ণকারীগণ খুব নৈপুণ্যতার সাথে বিবেচনা ও অধ্যয়ন করতে পারেন। যেমন , এই সব প্রকল্প গুলি খুব স্বল্প মেয়াদি প্রকৃতির (মোবাইলের OTP এর মতো ), এই প্রকল্পগুলি সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি সর্বাঙ্গীন বিকাশমুখী হওয়া উচিত। আমাদের রাজ্যে দীর্ঘমেয়াদী অভিনব (না কি চিরাচরিত) পলিসি ও পরিকল্পনা প্রয়োজন যেমন দিল্লি সরকার বা কেরালা সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন করে চলেছে। অন্যথা আমরা সংকীর্ণ দিকবিহীন রাজ্য বিকাশ পরিকল্পনার পরিচয় দিয়ে থাকব।
গবেষক, ইনস্টিটিউট অফ রুরাল ম্যানেজমেন্ট আনন্দ, গুজরাত
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct