এম মেহেদি সানি, খলতপুর, আপনজন: কয়েক দশক ধরে বিশেষত সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের মেধার উৎকর্ষের বিকাশ ঘটিয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে চলেছে আল আমীন মিশন। সেই আল আমীন মিশনের মূল ক্যাম্পাস হাওড়ার খলতপুরে দুদিন ব্যাপী বার্ষিক ‘আল আমীন উৎসব’-এর সূচনা হল শনিবার। দেশের ৭৪ তম প্রজাতন্ত্র দিবসের দু’দিন পর দুদিনের এই আল আমীন উৎসবে প্রজাতন্ত্র দিবসের নানা অনুষ্ঠানের ছায়া ফুটে উঠল। সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ হয়তো নয়, কিন্তু আল আমীন মিশনের ছাত্রদের ‘সেনাবাহিনী’র আদলের প্যারেড দুদিন পরেও প্রজাতন্ত্র দিবসের আবহ বিরাজমান ছিল। অতিথিদের বরণ করতে আল আমীন মিশনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এম নুরুল ইসলাম শুভেচ্ছার ডালি নিয়ে হাজির ছিলেন আল আমীন মিশনের প্রবেশ দ্বারে। সুদৃশ্য প্রবেশ দ্বারে ‘আই লাভ আল আমীন মিশন’ লিপি বুঝিয়ে দিচ্ছিল, শিক্ষা ও শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রেমীদের প্রতি নিবেদিত প্রাণ আল আমীন মিশন। সেই তোরণ ভেদ করে যখন অতিথিদের সাঙ্গ করে মিশন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করছিলেন ‘কর্নেল জেনারেল’ এম নুরুল ইসলাম তখন তাদের স্বাগত জানাতে ছাত্রদের প্যারেড-এর পরতে পরতে ছিল প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনের পরশ। আল আমীন মিশনের বিশাল সুদৃশ্য ক্যাম্পাসে বিরাজ করছিল উৎসবের আমেজ। শনিবার ছিল সেই উৎসবের সূচনার দিন। শেষ হবে রবিবার। প্রথম দিনেই অতিথি ও বিশিষ্টজনদের সমাহারে আল আমীন মিশনে বসেছিল চাঁদের হাট। আল আমীন মিশন উৎসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ত দফতর ও জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের মন্ত্রী পুলক রায় আল আমীন মিশনের ব্যাপ্তি ও ঐতিহ্যর কথা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। মন্ত্রী পুলক রায় বলেন, রাজ্যের শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে চলেছে। এই মুহূর্তে রাজ্যের দশ কোটি মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম হচ্ছে আল আমীন মিশন। আগামী দিনে দেশের ১২৩ কোটি মানুষের কাছে সর্ববৃহৎ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আল আমীন মিশনকে গড়ে তোলার শপথ নেওয়ার ডাক দেন মন্ত্রী পুলক রায়। এদিন আল আমীন মিশন কর্তৃপক্ষের চোখে সর্বকালের সেরা ছাত্র হিসাবে সৈয়দ মোহাম্মদ তামিমকে বিশেষ ভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। মোহাম্মদ তামিম এবছর নিটে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রথম বর্ষে পাঠরত। আদর্শ ছাত্র হিসেবে আল আমীনের এই স্বীকৃতি জীবনে এগিয়ে চলার পথকে আরও প্রসারিত করবে বলে আশা রাখেন তামিম।
আল আমীন মিশনের মেয়েদের মধ্যে আক্তারা পারভীন সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে এবছর নিটে সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ায় বিশেষ ভাবে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে আল আমীন মিশন কর্তৃপক্ষ। আক্তারা পারভীন পুলক রায়ের হাত থেকে বিশেষ পুরস্কার গ্রহণ করেন। করোনার কারলে দু’বছর পর আল-আমীন উৎসব আয়োজিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। এদিন আল-আমীন প্রাক্তনী বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারদের পাশাপাশি হবু ডাক্তারদের ভিড়ে মুখরিত ছিল খলতপুর আল-আমীন মিশন প্রাঙ্গণ। আল-আমীন উৎসবে দু’দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান থেকে পাঁচ শতাধিক আল-আমীন প্রাক্তন কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করেছে যারা বর্তমানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সিভিল সার্ভিসে সুযোগ পেয়েছেন। শনিবার প্রথম দিনে প্রথম পর্যায়ে শতাধিক প্রাক্তন কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। উপস্থিত বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে সংবর্ধনা গ্রহণ করেন আল-আমীন প্রাক্তনীরা, আল-আমীন মিশনের বেনজির সাফল্যের কারণে ওই সময় আল-আমীন মিশনের বর্তমান শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস ফেটে পড়ে। আল-আমীন উৎসবে শামিল হয়েছিলেন বহু শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। সবমিলিয়ে উৎসবের মেজাজ ছিল খলতপুর আল-আমীন মিশন ক্যাম্পাস। আল-আমীন উৎসবে আজ উপস্থিত হয়েছিলেন আল-আমীন মিশন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সর্বপ্রথম ডাক্তার হওয়া ডা. খন্দকার ফরিদউদ্দিন। আল-আমীন মিশন কর্তৃপক্ষ এদিন ডা. খন্দকার ফরিদউদ্দিন বিশেষভাবে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। ডা. খন্দকার ফরিদউদ্দিন ‘আপনজন’ প্রতিনিধিকে জানান, ‘আমি আল-আমীন মিশনে ভর্তি হই ১৯৮৭ সালে, ১৯৯৫ সালে আল আমীন মিশন থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করি এবং ১৯৯৬ সালে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অধিকার করে এনআরএস-এর ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাই।’ বর্তমানে ডা. খন্দকার ফরিদউদ্দিন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে কলকাতা মেডিকেল কলেজে কর্মরত। এদিন আল-আমীন মিশনের প্রথম দিককার বেশ কিছু প্রাক্তনী ডাক্তারদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, জ্যসভার সাংসদ ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হজ কমিটির চেয়ারম্যান মহম্মদ নাদিমুল হক, রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মহম্মদ শহিদুল ইসলাম, ওয়ার্ল্ড হোমিওপ্যাথি ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ মল্লিক প্রমুখ। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভারত সরকারের শ্রম ও রোজগার দপ্তরের রিজিওনাল পি.এফ. কমিশনার-২ শারিক তানবীর, উদয়নারায়ণপুরের বিডিও প্রবীরকুমার শিট প্রমুখ। শনিবার আল-আমীন মিশনে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় সন্ধ্যাকালীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দিলদার হোসেন। আর সার্বিক তদারকিতে ছিলেন হাফিজুর রহমান। সমগ্র অনুষ্ঠানটি আল-আমীন মিশনের নিজস্ব ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবের সম্প্রচারিত করার দায়িত্বে ছিলেন আল-আমীন মিশনের অন্যতম কর্মকর্তা জাহির আব্বাস। রাজ্যসভার সাংসদ ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হজ কমিটির চেয়ারম্যান মহম্মদ নাদিমুল হক এদিন বিভিন্ন মহান ব্যক্তিবর্গের উক্তি তুলে ছাত্র-ছাত্রীদের এগিয়ে চলার পরামর্শ দেন। শাহরুখ খানের পাঠান সিনেমার জনপ্রিয়তা তুলে ধরে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেন। রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান সমস্ত ছাত্রীদের উদ্দেশ্য বলেন, মেয়েরা কিছুতে কম নয়। তিনি হজরত মুহাম্মদ সা. সময়কালের সাহাবীদের বর্ণনা দিয়ে মেয়েদের অনুপ্রাণিত করেন। পাশাপাশি দেশ তথা রাজ্যের সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা রুখতে ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন হওয়অর আহ্বান জানান। আল-আমীনের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে ওয়ার্ল্ড হোমিওপ্যাথি ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ মল্লিক এদিন আল-আমীন কর্তৃপক্ষকে ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. সেখ মহম্মদ হোসেন বলে,ন আমাদের ৩৭ বছরের পথ চলাতে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, এখনো অনেক বাকি আছে পাওয়ার।অন্যান্যদের বিশিষ্টজনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আইএএস (অব.) মহম্মদ শহিদুল ইসলাম, ভারত সরকারের শ্রম ও রোজগার দপ্তরের রিজিওনাল পি.এফ. কমিশনার-২ শারিক তানবীর, উদয়নারায়ণপুরের বিডিও প্রবীরকুমার শিট প্রমুখ।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct