অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মালয়েশিয়ায় ক্ষমতায় আসা আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকার কতদিন টিকবে এই হিসাব শুরু করেছে অনেকে। যদিও প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো তিনি বেশ ভালোভাবে উতরে গেছেন। এর মধ্যে পেরিকাতানের বাইরের সব এমপির সমর্থনে সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়েছেন আনোয়ার। আস্থা ভোটে জয়ী হওয়ার চ্যালেঞ্জেও তিনি জিতেছেন। মন্ত্রিসভা গঠনে বিপত্তি হয়নি। এর পরও বেশ কিছু উদ্বেগ ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে আনোয়ারের সামনে। এ নিয়ে লিখেছেন মাসুম খলিলী। আজ শেষ কিস্তি।
ছয় রাজ্যের উপনির্বাচনের আগে সরকার আরো মাস ছয়েক সময় পেতে পারে। সরকারের প্রথম মাসটি প্রশাসনের অবয়ব প্রদান সংসদ অধিবেশন আহ্বান ও আস্থা ভোটের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পেরিয়ে গেছে। এখন সরকার জনগণের আশা আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কতটা কী স্বল্প মেয়াদে করতে পারছে তার ওপর রাজ্য নির্বাচনের ফল অনেকখানি নির্ভর করবে। আনোয়ারের প্রশাসন এ ক্ষেত্রে কয়েকটি অগ্রাধিকার সামনে রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। যার মধ্যে প্রথম হলো, জাতিতাত্ত্বিক উত্তেজনা নিরসন করে সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় আগের সরকারের সময় যেভাবে বেড়েছিল সেটি নিয়ন্ত্রণে এনে জনগণকে স্বস্তি দেয়া। তৃতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিশেষভাবে দেশী বিদেশী বিনিয়োগে গতি এনে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন চাঙ্গা করা। এ লক্ষ্য অর্জনে স্থিতিশীল সরকার গঠনের যে ভিত্তি প্রয়োজন সেটি আনোয়ার এর মধ্যে সম্পন্ন করতে পেরেছেন। স্থানীয় মুদ্রা রিংগিতের দাম বাড়তে শুরু করেছে। শেয়ারবাজারের সূচক আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। দেশী বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আবার মালয়েশিয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে মূল্য প্রটেকশনের একটি প্রক্রিয়া নিয়ে এর মধ্যে কাজ শুরু করেছেন আনোয়ার। এ ক্ষেত্রে সাফল্য এলে এর সুফল রাজ্য নির্বাচনে কিছুটা হলেও পাবেন আনোয়ার।
আনোয়ারের সামনে আরো দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যেগুলোর প্রতি নজর রাখতে হবে। একটি হলো ক্ষমতার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ সুলতানদের সমর্থন বজায় রাখা আর দ্বিতীয়টি হল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বিধান করা। মালয়েশিয়ার ডিপ স্টেটের অসমর্থনকে এতদিন আনোয়ার ইব্রাহিমের ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসাবে চিহ্নিত করা হতো। এবার সেটিই আনোয়ারের সরকার গঠনে প্রধান সহায়ক হিসেবে দেখা গেছে। এর পেছনে একটি কারণ হতে পারে মালয় শাসকরা দেশটিতে স্থিতি এবং অর্থনৈতিক টেকসই অগ্রগতি দেখতে চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আনোয়ারের বিকল্প হয়তো বা তারা আর কারো মধ্যে পাননি। সুলতানদের এই সমর্থন ঐক্য সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ভেতর থেকে শক্তি জুগিয়েছে। আনোয়ারের জোট বিগত নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও পাকাতানের একক সরকার গঠনকে ডিপ স্টেট সমর্থন করতে চায়নি, সেটি হলে এতে চীনা প্রধান ডিএপির প্রভাব বাড়বে আশঙ্কায়। কিন্তু এখন ব্যাপকভিত্তিক ঐক্য সরকার গঠনের ফলে ডিএপির প্রভাব একদিকে সরকারে সীমিত হয়েছে, অন্য দিকে মালয় দল ও রাজনীতিবিদের নিয়ন্ত্রণ সরকারে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আনোয়ার ইব্রাহিম এ বিষয়টি জানতেন বলে তিনি নির্বাচনে আগে থেকে মালয় প্রভাব বিশিষ্ট একটি সরকারের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তুত করছিলেন নিজেকে। এটি তার ঐক্য সরকারের প্রতি সমর্থন এবং সরকার গঠনে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে। আর এ ব্যাপারে মালয়েশিয়ার রাজা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন আনোয়ার পেয়েছেন জহুরের প্রভাবশালী সুলতানের কাছ থেকে। তিনি সম্ভবত মালয়েশিয়ার পরবর্তী রাজা হতে যাচ্ছেন। আনোয়ার ইব্রাহিম মালয় শাসক ও মালয় স্বার্থের ব্যাপারে সজাগ থেকে সরকার চালালে এই সমর্থন তার পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে।
মালয়েশিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিতে বাইরের প্রভাব অন্য অনেক দেশের তুলনায় একবারে প্রকাশ্য হয়ে ওঠে না। তবে দেশটির অনেক রাজনৈতিক উত্থান-পতনে বাইরের প্রভাব ভূমিকা রাখে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্র বলয়, বৃহৎ প্রতিবেশী চীন এবং ওআইসির প্রভাবশালী দেশগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এবারের সরকার গঠনে চীনা প্রভাব খুব বড়ভাবে কাজ করেছে বলে মনে হয়নি। ওআইসির মধ্যে সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অতি সক্রিয় কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। তবে মালয়েশিয়া পাসের মতো একটি ইসলামিস্ট দলের প্রাধান্য সম্বলিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়টি পাশ্চাত্য বলয় পছন্দ করেনি বলে মনে হয়েছে। এ কারণে পেরিকাতানের ক্ষমতায় যাওয়ার চেয়ে আনোয়ারের নেতৃত্বাধীন সরকারকে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো বেশি পছন্দ করেছে বলে মনে হয়। আনোয়ার ইব্রাহিম পোড় খাওয়া এমন এক রাজনীতিবিদ যিনি মালয়েশিয়ার রাজনীতি ও রাষ্ট্রকে যেমন বেশ ভালোভাবে বোঝেন তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণও ভালোভাবে উপলব্ধি করেন। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র নীতিতে চীনের চেয়েও পশ্চিমা বলয় বেশি গুরুত্ব পায়। আর একই সাথে ওয়াইসি দেশগুলোর মধ্যে একটি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা থাকে মালয়েশিয়ার। আনোয়ার ইব্রাহিম এই ভূমিকায় আবার মালয়েশিয়াকে নিয়ে যেতে পারবেন বলে মনে হয়। তবে তিনি মালয়েশিয়াকে বিশ্ব রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলবেন বলে মনে হয় না। পাশ্চাত্যের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা মালয়েশিয়ার জন্য অনুকূল হতে পারে; কিন্তু চীনের সাথে দক্ষিণ চীনসাগর বা তাইওয়ানকেন্দ্রিক যে সঙ্ঘাত পাশ্চত্যের সাথে চীনের উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাতে টুলস হিসেবে ব্যবহার হওয়ার ভূমিকায় আনোয়ার কুয়ালালামপুরকে নেবেন বলে মনে হয় না। (সমাপ্ত...)
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct