মোল্লা মুয়াজ ইসলাম, বর্ধমান, আপনজন: বর্ধমান শহরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ আছে যার নাম “ভেরিখানা মসজিদ”। এই মসজিদটি ভেড়িখানা নামক স্থানে আছে বলেই এর নাম “ভেড়িখানা” মসজিদ বলেই মনে হয়। ভেরি / ভেড়ি অর্থাৎ ঢাক,দামামা, রণসিঙ্গা। এবং খানা ফার্সি শব্দ অর্থাৎ স্থান, গৃহ, স্থান। মনে করা হয় ভেরি বাদক রা বসবাস করতেন বলে এর নাম ভেড়ী খানা,বা ভেরি খানা। বর্তমানে ভেরিবাদকরা যেখানে বসবাস করত এখন বসতি নেই। কারণ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ওখানে কর্মচারীদের আবাসন তৈরি করেছে। মসজিদটির নাম “ভেরি খানা জামে মসজিদ”। এই মসজিদের ভিতরে একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে জনৈক” বুদ্ধ হাজী”- ১২৮০ হিজরি অর্থাৎ ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। “বুদ্ধ হাজী” কে ছিলেন এ বিষয়ে বিশদ কিছু জানা যায় না ,তবে “বুদ্ধ” নাম থেকে মনে হচ্ছে তিনি পরবর্তীকালে ইসলামের সুশীতল ছত্রছায়ায় এসেছিলেন। এই মসজিদটি প্রথমে একটি গম্বুজ চারটে মিনার ছিল ,পরবর্তীকালে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে মসজিদের একটি ব্যান্ড তৈরি হয়। এবং তারপরে ২০১১ সালে মসজিদটির ত্রিতল হয় এবং আরও একটি গম্বুজ একটি বড় মিনার নির্মাণ হয়। বর্তমানে মসজিদটির দুটি গম্বুজ আটটা মিনার আছে। অর্থাৎ মসজিদটির বয়স এখন ১৬৪ বছর। এই মসজিদটির ঠিক উল্টোদিকে একজন পীরের কবর আছে, পীরতলায় লেখা আছে “শাহ দরিয়া, শাহ খিজিরে রুমি র: আ:”। শাহ শব্দের অর্থ বাদশা, এবং দরিয়া শব্দের অর্থ সমুদ্র বা বড় নদী, বড়পুকুর , খিজির শব্দের অর্থ অলি, পীর, মহান মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি। এই অলি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে তিনি একজন পীর ও জ্ঞানী অর্থাৎ জ্ঞানের সমুদ্র ছিলেন তা বোঝা যায়। অমুসলিমরা এই পীরকে জলের দেবতা বলে মান্যতা দেন।
এই পীরের উপাধি “খিজিরের রুমি” অর্থাৎ ইনি তুরস্কের মানুষ ছিলেন, প্রাচীন ইতিহাস দেখলে দেখা যায় তুরস্কের সেলযুক প্রদেশ থেকে সুফি সাধক” হযরত শাহ সুলতান কোমর উদ্দিন রুমি” রাজ পরিবার বা রাজ্য ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির অর্জনের জন্য ও ইসলাম প্রচারের জন্য বন, জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, নদী সমুদ্র, মরুভূমি পেরিয়ে বাংলায় চলে আসেন। কোথাও কোথাও বলা হয়েছে ১০জন সহচর সহ সুফি সাধক “কমল উদ্দিন রুমি” উপস্থিত হয়েছিলেন। অপরদিকে দেখা যায় যে ১৬৯৬-৯৭ খ্রিস্টাব্দে “সম্রাট ঔরঙ্গজেবের “পৌত্র “আজিম উস সান” শরিফা বাদে উপস্থিত হলে তিনি বাঁকার নদীর ওপর আলমগঞ্জ অর্থাৎ আলমগিরের নামে “আলমগঞ্জ সেতু”নির্মাণ করার সময় এই পীর অর্থাৎ “শাহ দরিয়া শাহ খিজরে রুমি”সহযোগিতা নিয়েছিলেন, এই পীর, নদী পথ, জল,বিভিন্ন নির্মাণ অর্থাৎ জলের ওপর নির্মাণ বিশেষজ্ঞ ছিলেন বলেই জ্ঞানের সাগর বা দরিয়া উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। দামোদর নদ শরীফবাদের উত্তর দিক যখন ভাঙন ধরেছিল কাঞ্চননগরকে রক্ষা করার জন্য এই পীর বাবা বাঁধ তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং ফলপ্রসূ করিয়েছিলেন। এবং বাঁকা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করার সময় প্রত্যক্ষভাবে ইনি সহযোগিতা করেছিলেন বলেই শোনা যায়্ শাহজাদা “আজিম মুশ শান” বাঁকা নদীর উপর “আলমগঞ্জ সেতু” করার সময় বর্তমান ভেড়িখানার সামনে গোলাঘর অর্থাৎ গোলা বাড়ি নির্মাণ করিয়েছিলেন। এবং সঙ্গে ঘোড়া রাখা আস্তা বল তৈরি করেছিলেন। যা আজও বর্তমান। এই ভেড়িখানা মসজিদ যখন নির্মাণ হচ্ছে শিলালিপি অনুযায়ী তারিখ ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ। অর্থাৎ এর ঠিক এক বছর আগে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহ অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছে, মুসলমানদের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে, এবং ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদ নির্মাণের সময় ,ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার অর্থাৎ ইংল্যান্ডের রানী নিজের হাতে ভারতের শাসন ব্যবস্থা তুলে নেন। অপরদিকে বর্ধমানের সামন্ত রাজা অর্থাৎ জমিদার আফতাব চাঁদ মহাতাব মৃত্যুবরণ করেছেন ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ই। এই মসজিদের ই সি নাম্বার ১৩৮৯৩ বলে জানালেন মসজিদ পরিচালন কমিটির সম্পাদক ফারুক আনসারী।
All Rights Reserved © Copyright 2025 | Design & Developed by Webguys Direct